ঢাকায় কাজ করে টাকা জমিয়ে বাবা-মায়ের জন্য নতুন ঘর বানানোর স্বপ্ন ছিল বাক্প্রতিবন্ধী মেহেদী হাসান মিমের। সেই ঘরে বাবা-মাকে নিয়ে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তবে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ঢাকায় কাজ করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মিম শেষ পর্যন্ত নতুন ঘরেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।
বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মিমের মরদেহ ডোমারের নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। দুপুর ৩টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মিমের মৃত্যুতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তার মা মিনু বেগম।
মিমের মা বলেন, ‘চার দিন আগে মিম ঢাকায় যায়। যাওয়ার সময় বলেছিল, মা এবার টাকা জমিয়ে নতুন ঘর বানাবো। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।’ এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তার আহাজারিতে উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে আসে।
মেহেদী হাসান মিম (২৪) নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ৯ নম্বর সোনারায় ইউনিয়নের হাজীপাড়া গ্রামের এরশাদুল হকের ছেলে। তিনি ডোমার সরকারি কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
গত মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার বারিধারা এলাকার কে ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাসার সামনে আসরের নামাজ শেষে ফুটপাতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মিম। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি কালো রঙের গাড়ি তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
মিমের খালাতো ভাই রানা জানান, মিম বাক্প্রতিবন্ধী ছিলেন। তিনি কানে শুনতে ও কথা বলতে পারতেন না। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বাবা-মায়ের দায়িত্বও তিনি পালন করতেন। প্রতি মাসে বাবা-মাকে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিতেন। পরিবারের কোনো আবাদি জমি নেই, শুধু বাড়ির ভিটাটুকু রয়েছে।
রানা আরও জানান, সোমবার রাতে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে মিম ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন এবং মঙ্গলবার ভোরে সেখানে পৌঁছান। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসার পাশাপাশি তিনি রাজমিস্ত্রির কাজও করতেন। কাগজের ফুল তৈরি, আর্টসহ বিভিন্ন শৈল্পিক কাজেও দক্ষ ছিলেন মিম।
মিমের বড় ভাই মুক্তাদির বিয়ে করে আলাদা সংসারে থাকেন। একমাত্র বোনেরও বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে বাবা-মাকে নিয়েই মিমের সংসার চলত।
এদিকে মিমের মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর আযান আলী শরীফ নামে এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাড়ি চালানোর সঙ্গে আযান জড়িত থাকলেও মামলায় গাড়ির চালককে আসামি করা হয়েছিল। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়। পরে আদালত আযানকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আযানের আইনজীবী আদালতকে জানান, ৯ লাখ টাকায় বিষয়টি আপস হয়েছে। তবে মিমের পরিবার এখন পর্যন্ত ওই অর্থের মধ্যে ৮ লাখ টাকা পায়নি বলে জানিয়েছে। মরদেহ বাড়িতে আনার সময় চালকের পাইলট বাবা পরিবারকে ১ লাখ টাকা দেন। বাকি ৮ লাখ টাকা মিম যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের মাধ্যমে দেওয়ার কথা রয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এফপি/র