ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের কীর্তি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে সেই বিরল ফুটবলারদের একজন। তিনবার বিশ্বকাপ জয়, অসংখ্য গোল আর মাঠে অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যের মাধ্যমে ফুটবলকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। শুধু গোল করার দক্ষতা নয়, নিজের অসাধারণ খেলার ধরন দিয়েও বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।আজ ২৩ অক্টোবর, ফুটবলের এই মহাতারকার ৮৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪০ সালের এই দিনে ব্রাজিলের ত্রেস কোরাসোয়েস শহরে জন্মগ্রহণ করেন এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘পেলে’ নামেই পরিচিত।
ফুটবলের রাজার জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তার বর্ণাঢ্য জীবন ও ক্যারিয়ারের ১০টি বিস্ময়কর কীর্তি ও অজানা তথ্য।
১. থমাস এডিসনের নাম থেকে এডসনপেলের পুরো নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। মার্কিন বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক থমাস এডিসনের নাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তার বাবা-মা এই নাম রেখেছিলেন। তবে জন্মনামের চেয়ে শৈশবের ডাকনাম ‘পেলে’ দিয়েই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। পরবর্তী সময়ে এই নামই হয়ে ওঠে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় পরিচয়।
২. যে ডাকনাম একসময় পছন্দ করতেন নাছোটবেলায় পরিবারের সদস্যরা পেলেকে ‘ডিকো’ নামে ডাকতেন। স্কুলজীবনে ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক বিলের নাম ভুল উচ্চারণ করার কারণে সহপাঠীরা তাকে ‘পেলে’ বলে ডাকতে শুরু করে।
শুরুতে নামটি মোটেও পছন্দ করতেন না তিনি। অথচ সেই নামই একসময় বিশ্বজুড়ে তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। কোটি মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের রাজা।
৩. মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জয়১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্ব ফুটবলে নিজের আগমনের ঘোষণা দেন পেলে।
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে করেন দুটি গোল। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে ব্রাজিল ৫-২ ব্যবধানে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে।
মাত্র ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করে ইতিহাস গড়েন পেলে। এখনো বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার তিনি।
৪. তিনবার বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র ফুটবলারপেলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন তিনটি বিশ্বকাপ জয়। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন তিনি।
ফুটবল ইতিহাসে খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার পুরুষদের বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি এখনো একমাত্র পেলের দখলে।
বিশেষ করে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বগুণ, গোল করার দক্ষতা ও সৃজনশীল ফুটবল ব্রাজিলকে এনে দেয় তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।
৫. গোলসংখ্যা নিয়ে আজও আলোচনাপেলের ক্যারিয়ারে মোট গোলের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। প্রীতি ও প্রদর্শনী ম্যাচসহ তার ক্যারিয়ারে ১ হাজার ২৮৩ গোলের হিসাব বহুল প্রচলিত।
তবে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা কমে যায়। বিভিন্ন পরিসংখ্যান সংস্থার হিসাবেও কিছু পার্থক্য রয়েছে।
ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ৯২টি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৭৭ গোল করেছিলেন পেলে। দীর্ঘদিন এটি ছিল ব্রাজিলের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড।
৬. এক ম্যাচেই আট গোলের অবিশ্বাস্য কীর্তি১৯৬৪ সালের ২১ নভেম্বর ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসের হয়ে এক অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েন পেলে।
ক্যাম্পিওনাতো পাউলিস্তার ম্যাচে বোতাফোগো-এসপির বিপক্ষে একাই আট গোল করেন তিনি। সেদিন সান্তোস প্রতিপক্ষকে ১১-০ ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে।
এক ম্যাচে আট গোল পেলের ক্যারিয়ারের অন্যতম বিস্ময়কর অর্জন। তার অসাধারণ ফিনিশিং দক্ষতার উদাহরণ হয়ে আছে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ।
৭. ক্যারিয়ারের হাজারতম গোল১৯৬৯ সালের ১৯ নভেম্বর ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় এক মুহূর্তের জন্ম দেন পেলে। ব্রাজিলের বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে ভাস্কো দা গামার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে ক্যারিয়ারের বহুল আলোচিত হাজারতম গোলটি করেন তিনি।
এই গোল ‘ও মিলেসিমো’ নামে পরিচিতি পায়। ঐতিহাসিক মুহূর্তটি উদযাপন করতে মাঠে নেমে আসেন অসংখ্য দর্শক ও সাংবাদিক।
তবে হাজারতম গোলের এই হিসাবে প্রীতি ও অন্যান্য ম্যাচের গোলও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৮. গারিনচার সঙ্গে অপরাজিত জুটিব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তি গারিনচার সঙ্গে পেলের জুটি ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
বহুল প্রচলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় দলের হয়ে পেলে ও গারিনচা একসঙ্গে মাঠে থাকা কোনো ম্যাচেই হারেনি ব্রাজিল।
দুজনের অসাধারণ বোঝাপড়া, গতি, ড্রিবলিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল ব্রাজিলের সোনালি যুগকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
৯. বিদায়ী ম্যাচে দুই ক্লাবের জার্সি১৯৭৭ সালের ১ অক্টোবর পেশাদার ফুটবলকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান পেলে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির জায়ান্টস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তার বিদায়ী ম্যাচ।
সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল তার ক্যারিয়ারের দুই ক্লাব নিউইয়র্ক কসমস ও সান্তোস।
ম্যাচের প্রথমার্ধে কসমসের হয়ে এবং দ্বিতীয়ার্ধে সান্তোসের জার্সিতে খেলেন পেলে। প্রথমার্ধে কসমসের হয়ে একটি গোলও করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কসমস ২-১ ব্যবধানে ম্যাচটি জেতে।
দুই ক্লাবের জার্সিতে একই ম্যাচ খেলে বিদায় নেওয়ার এই ঘটনা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে আছে।
১০. ফুটবল মাঠের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ অবদানপেলের অবদান শুধু ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে সামাজিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক দায়িত্বেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পেলে। দেশটির ক্রীড়াঙ্গনে স্বচ্ছতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন তিনি।
ফুটবলের বিশ্বায়ন এবং খেলাধুলার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এই কিংবদন্তি।
চিরস্মরণীয় এক ফুটবল কিংবদন্তি২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানান পেলে। তবে তার মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায়নি ফুটবলের এই মহানায়কের গল্প।
তিনটি বিশ্বকাপ জয়, অসংখ্য স্মরণীয় গোল এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা তাকে ফুটবল ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
বিশ্ব ফুটবলে অনেক তারকা এসেছেন, অনেকেই গড়েছেন নতুন নতুন রেকর্ড। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাস, জনপ্রিয়তা ও বিশ্বব্যাপী বিস্তারে পেলের মতো প্রভাব রাখতে পেরেছেন খুব কম খেলোয়াড়ই।
তাই মৃত্যুর পরও কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন এক অনন্য পরিচয়ে—‘ফুটবলের রাজা’।
এফপি/মিব