Dhaka, Sunday | 1 February 2026
         
English Edition
   
Epaper | Sunday | 1 February 2026 | English
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ২২৪.২৬ কোটি টাকার রপ্তানি আদেশ
বিশ্বকাপ থেকে কি সরে দাঁড়াচ্ছে পাকিস্তান
সারাদেশে মোতায়েন থাকবে ৩৭ হাজার বিজিবি সদস্য
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বিশাল পতন, দুই দিনে কমলো ৮০ হাজার টাকা
শিরোনাম:

লাইলাতুল বরাত: ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক পুনর্জাগরণের রাত

প্রকাশ: শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম  (ভিজিটর : ১২)

ইসলামি বর্ষপঞ্জির পবিত্র রাতগুলোর মধ্যে শাবান মাসের মধ্যরাতে পালিত লাইলাতুল বরাত মুসলমানদের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই রাতকে রহমত, ক্ষমা ও ভাগ্য নির্ধারণের রাত হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এ রাতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য করুণা ও ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং তাদের তওবা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ প্রদান করেন। লাইলাতুল বরাত কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এর মধ্যে নিহিত রয়েছে গভীর নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষা, যা আজকের অশান্ত বিশ্বে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

‘লাইলাতুল বরাত’ শব্দের অর্থ হলো ‘মুক্তির রাত’ বা ‘পরিত্রাণের রাত’। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন এবং আগামীর জীবনের জন্য তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এ সময় আন্তরিক তওবা কবুল হয়, দোয়া গ্রহণ করা হয় এবং আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়। তাই মুসলমানরা সারারাত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও আত্মসমালোচনায় কাটান।

তবে লাইলাতুল বরাতের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আত্মসমালোচনা, নৈতিক সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের আহ্বান। ভোগবাদ, স্বার্থপরতা ও সংঘাতে পূর্ণ আধুনিক বিশ্বে এই রাতের শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষমার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

লাইলাতুল বরাতের মূল শিক্ষা হলো ক্ষমা। ইসলাম শেখায়—আল্লাহ পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল, যিনি আন্তরিকভাবে ফিরে আসা বান্দাকে কখনোই নিরাশ করেন না। তবে ক্ষমা শুধু মুখে চাওয়ার বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন সত্যিকার অনুশোচনা, পাপ ত্যাগের দৃঢ় সংকল্প এবং সৎ পথে চলার অঙ্গীকার।

আজকের সমাজে মানুষ ঘৃণা, প্রতিশোধ ও বিদ্বেষের চক্রে আবদ্ধ। ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বিভাজন ক্রমেই সহিংসতা বাড়াচ্ছে। লাইলাতুল বরাত আমাদের শেখায়—ক্ষমাই পারে হৃদয়ের ক্ষত সারাতে, জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষমাশীলতা মানুষকে মানসিক ভারমুক্ত করে। আর বৃহত্তর পরিসরে সমাজ যদি ক্ষমার চর্চা করে, তবে অতীতের শত্রুতা ভুলে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয়। পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সব স্তরেই এই শিক্ষা প্রয়োগযোগ্য।

নৈতিক সংকটের সময়ে আত্মশুদ্ধির আহ্বান

বর্তমান বিশ্ব গভীর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি, অসততা, লোভ ও অবিচার বহু ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতি, ব্যবসা এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও মূল্যবোধ বিসর্জনের চিত্র স্পষ্ট।

লাইলাতুল বরাত আমাদের আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলাম বলে—সফলতা সম্পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং হৃদয়ের পবিত্রতা ও ন্যায়ের পথে চলায়। এই রাত মানুষকে নিজের ভুল চিনতে, সংশোধনের পথে এগোতে অনুপ্রাণিত করে।

আত্মসমালোচনা ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। ব্যক্তি যদি সততা, ন্যায় ও মানবিকতায় ফিরে আসে, তবে সমাজও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে। তাই লাইলাতুল বরাত এক ধরনের নৈতিক প্রশিক্ষণের রাত—যেখানে মানুষ শিখে শৃঙ্খলা, বিনয় ও দায়িত্ববোধ।

আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত চর্চা

দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গায় লাইলাতুল বরাত বাহ্যিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। আতশবাজি, উচ্চস্বরে অনুষ্ঠান কিংবা লোক দেখানো আয়োজন রাতটির আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আড়াল করে দেয়। অথচ ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—নীরব সাধনা, আন্তরিক তওবা ও আত্মোপলব্ধি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ মানুষের বাহ্যিক রূপ নয়, বরং অন্তরের নিয়ত দেখেন। তাই লাইলাতুল বরাতের প্রকৃত উদযাপন হলো হৃদয়ের পরিবর্তন। আনুষ্ঠানিকতার বদলে যদি আমরা আত্মশুদ্ধিকে গুরুত্ব দিই, তবে এই রাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকতা

লাইলাতুল বরাত কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের রাত নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলাম সর্বদা গরিব, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে।

এই রাতে নিজের ক্ষমার জন্য দোয়ার পাশাপাশি মানবজাতির কল্যাণ কামনা করা এবং বাস্তব জীবনে দান-খয়রাত ও সেবামূলক কাজে অংশ নেওয়াই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।

আজ বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্য বাড়ছে। এমন সময়ে লাইলাতুল বরাত আমাদের সহমর্মিতা শেখায়। প্রকৃত ধার্মিকতা কেবল ইবাদতে নয়, বরং মানুষের কষ্ট লাঘবে অংশগ্রহণেই পূর্ণতা পায়।

নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য শিক্ষা

লাইলাতুল বরাতের নৈতিক শিক্ষা শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, রাষ্ট্র পরিচালকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা যখন নৈতিকতা হারায়, তখন তা নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

ইসলাম নেতৃত্বে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও সেবার মানসিকতা চায়। এই রাতে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে শাসকদেরও আত্মসমালোচনা করা উচিত—তারা কি জনগণের অধিকার রক্ষা করছে? দুর্নীতি থেকে দূরে আছে? জনস্বার্থে কাজ করছে?

নৈতিক নেতৃত্বই পারে একটি জাতিকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে।

অশান্ত বিশ্বের জন্য আশার বার্তা

আজকের পৃথিবী যুদ্ধ, সহিংসতা ও বিভাজনে ভরা। ভয় ও ঘৃণাই যেন বৈশ্বিক রাজনীতির ভাষা হয়ে উঠেছে।

লাইলাতুল বরাত আমাদের আশার আলো দেখায়। এটি শেখায়- অতীত যতই অন্ধকার হোক, তওবা ও পরিবর্তনের পথ সবসময় খোলা। ক্ষমা, বিনয় ও মানবিকতাই শান্তির ভিত্তি।

যদিও এটি একটি ইসলামি রাত, এর শিক্ষা সার্বজনীন। মানবতা যদি এই মূল্যবোধ গ্রহণ করে, তবে বহু সংঘাত সংলাপ ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

ব্যক্তিগত পরিবর্তনই সামাজিক পরিবর্তনের চাবিকাঠি

কোরআনে বলা হয়েছে- মানুষ নিজেকে পরিবর্তন না করলে আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না। লাইলাতুল বরাত এই সত্যকে সামনে আনে।

হৃদয়ের পরিশুদ্ধতা, সংযম ও সততার চর্চা পরিবারকে শক্তিশালী করে, সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রকে সুশাসনের পথে নেয়। তাই এই রাত একবারের ঘটনা নয়; বরং সারাবছরের জন্য নৈতিক পথনির্দেশনা।

প্রকৃত চেতনায় ফিরে আসা

লাইলাতুল বরাতের পূর্ণ সুফল পেতে হলে আমাদের প্রয়োজন লোক দেখানো আচার নয়, আন্তরিক তওবা ও ইবাদত, নিজের আচরণ পর্যালোচনা ও নৈতিক সংশোধন, অন্যকে ক্ষমা ও সম্পর্কের পুনর্মিলন, দান-খয়রাত ও সামাজিক সেবায় অংশগ্রহণ, জীবনের সব ক্ষেত্রে সততা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, ওলামায়ে কেরাম, শিক্ষক ও সমাজনেতারা এই রাতের প্রকৃত শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

লাইলাতুল বরাত কেবল ইবাদতের রাত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, নৈতিক জাগরণ ও সামাজিক সংস্কারের এক মহামূল্যবান সুযোগ। এটি আমাদের আল্লাহর অসীম রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধে জীবন গড়ার আহ্বান জানায়।

সংঘাত, দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয়ে ভরা এই বিশ্বে লাইলাতুল বরাতের শিক্ষা আশার আলো। ক্ষমা হৃদয় সারায়, আত্মশুদ্ধি নৈতিকতা ফিরিয়ে আনে, আর সহমর্মিতা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে।

আসুন, এই পবিত্র রাতে আমরা আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে সত্যিকার পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হই। সারা বছর যদি আমরা এই শিক্ষাকে ধারণ করি, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্ব—সব ক্ষেত্রেই শান্তি ও ন্যায়ের বিজয় সম্ভব হবে।

এফপি/অ
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: news@thefinancialpostbd.com, ad@thefinancialpostbd.com, hr@thefinancialpostbd.com
...
🔝