জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অনন্য মুহূর্ত তৈরি করেছিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা, ভয়ের সংস্কৃতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে যে প্রতিবাদী স্রোত তৈরি হয়েছিল, তা শুধু একটি সরকার বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল না, তা ছিল পুরো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে। সেই আন্দোলনের ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা, নতুন ভাষা ও নতুন সম্ভাবনার বয়ান।
এই প্রেক্ষাপটেই জাতীয় রাজনীতিতে আবির্ভূত হয় নতুন দল এনসিপি। এনসিপি নিজেকে উপস্থাপন করেছিল পুরোনো রাজনীতির বৃত্ত ভাঙার এক সাহসী প্রচেষ্টা হিসেবে। আদর্শিক স্পষ্টতা, ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থান এবং তরুণ নেতৃত্ব—এই তিনটি উপাদান দলটিকে আলাদা করেছিল প্রচলিত দলগুলোর ভিড় থেকে। বিশেষ করে তরুণ নারীদের সক্রিয় ও দৃশ্যমান অংশগ্রহণ এনসিপিকে দিয়েছিল ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিচয়। জুলাই আন্দোলনের অনেক মুখ এনসিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দলটিকে এক ধরনের নৈতিক বৈধতা এনে দিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই সম্ভাবনার রাজনীতিই আজ গভীর সংকটে। জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা ও জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির রাজনৈতিক পরিচয়কে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করেনি, বরং দলটির অস্তিত্বগত সংকটকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পরপরই যে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—নারী নেত্রীদের পদত্যাগ, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো কিংবা প্রকাশ্য বিরোধিতা—তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রতিবাদের ধারা।
তাসনিম জারা ও তাজনূভা জাবীনের পদত্যাগ, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো, নুসরাত তাবাসসুমের নির্বাচনী কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণা এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিনের প্রকাশ্য মন্তব্য—যেখানে তিনি জামায়াতের সঙ্গে জোটকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—সব মিলিয়ে এটি এনসিপির ভেতরের নৈতিক ভাঙনের একটি পূর্ণ চিত্র।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই নারীরা কেউই বাইরের পর্যবেক্ষক নন। তারা সবাই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে উঠে আসা মুখ, যাদের কাঁধে ভর করেই এনসিপি নিজেকে নতুন রাজনীতির বাহক হিসেবে তুলে ধরেছিল। অর্থাৎ এনসিপির সবচেয়ে বড় শক্তি—নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও তরুণদের আস্থা—সেই জায়গাতেই আঘাত লেগেছে।
এই সংকটের মূল জায়গাটি আদর্শিক। জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক বয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জামায়াতবিরোধিতা। এই বিরোধিতা শুধু অতীতের ভূমিকার কারণে নয়; বরং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, নারী প্রশ্নে রক্ষণশীল অবস্থান, সংখ্যালঘু অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে জামায়াতের অবস্থান তরুণ আন্দোলনকারীদের বড় অংশের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল। সেই বাস্তবতায় জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন মানে ছিল নিজের রাজনৈতিক শেকড়ের সঙ্গেই আপস করা।
এমন আপস যে দলটির ভেতরে ভয়াবহ বিভাজন তৈরি করবে, তা অনুমান করতে খুব গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন ছিল না। এনসিপির সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করেছিল, এই দলটি পুরোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে রাজনীতি করবে। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মধ্য দিয়ে সেই বিশ্বাস ভেঙে পড়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই জোটের ফলে এনসিপি আর স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। নির্বাচন, আসন বণ্টন, প্রচারণা—সব ক্ষেত্রেই বড় শরিকের প্রভাব ও চাপ অনিবার্য হয়ে উঠবে। এতে এনসিপি কার্যত একটি সহায়ক শক্তিতে পরিণত হবে, প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন তারা দেখিয়েছিল, তা কাগুজে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এনসিপির জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। নতুন দল হিসেবে এই নির্বাচনে তাদের সবচেয়ে বড় পুঁজি ছিল নৈতিক অবস্থান ও তরুণদের আস্থা। কিন্তু জামায়াত জোট সেই পুঁজিকেই ক্ষয় করে দিয়েছে। যে তরুণরা পরিবর্তনের আশায় রাজপথে নেমেছিল, তারা এখন প্রশ্ন করছে—এই পরিবর্তন কি কেবল ক্ষমতার অঙ্ক বদলের জন্য ছিল? নাকি আদর্শের জায়গায় আপস করাই ছিল শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য?
এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। এই দল কি নিজের রাজনৈতিক মৃত্যু নিজেই ডেকে আনলো? যখন দলের ভেতরের সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক কণ্ঠগুলো একে একে সরে যাচ্ছে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং দলটির সামগ্রিক দিকনির্দেশনা নিয়েই গভীর প্রশ্ন তৈরি করে।
এনসিপির এই সংকটের সঙ্গে আরেকটি রাজনৈতিক ঘটনা গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে—এলডিপি নেতা কর্নেল অলি আহমদের জামায়াত জোটে যোগদান। অলি আহমদের রাজনৈতিক অতীত বিবেচনায় নিলে এই সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর। একসময় তিনি জামায়াত জোটে থাকা নিয়ে প্রকাশ্যে আপত্তি তুলেছিলেন। সেই বিরোধিতার ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে তিনি বিএনপি ছেড়ে এলডিপি গঠন করেন।
আজ সেই অলি আহমদই সব অবস্থান ভুলে জামায়াত জোটে যোগ দিলেন। অনেকের কাছে এটি নিছক রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। অতীতেও নিজের সংসদীয় আসন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল। এবার সেই অভিযোগ আরও স্পষ্ট হলো। মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলা, জামায়াতবিরোধিতার ভাষা ব্যবহার করা—সবই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার অঙ্কের কাছে হার মানলো।
এই দুই ঘটনা—এনসিপির ভেতরের ভাঙন এবং অলি আহমদের অবস্থান পরিবর্তন—বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দাঁড় করায়। এখানে আদর্শ প্রায়ই ক্ষমতার অঙ্কের কাছে পরাজিত হয়। নতুন দল হোক বা পুরোনো নেতা, শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় নির্বাচনী হিসাব ও ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে।
কিন্তু যে রাজনীতি পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়, তার জন্য এই বাস্তবতা সবচেয়ে বিপজ্জনক। এনসিপির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ এই দলটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক। সেই প্রতীক ভেঙে পড়লে শুধু একটি দল ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবিষ্যতের যেকোনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা।
তরুণরা তখন প্রশ্ন করবে—নতুন দল মানেই কি শেষ পর্যন্ত পুরোনো সমঝোতা? আদর্শের রাজনীতি কি বাংলাদেশে আদৌ সম্ভব?
সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন এনসিপির জন্য হয়তো কৌশলগত কিছু সুবিধা আনতে পারে, কিন্তু আদর্শিক ক্ষতি এরইমধ্যে স্পষ্ট ও গভীর। নারী নেত্রীদের সরে যাওয়া সেই ক্ষতির সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র। আর অলি আহমদের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের অবস্থান বদল দেখিয়ে দেয়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ নয়, স্বার্থই এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি।
এই বাস্তবতায় এনসিপি যদি নিজেদের পথ ও অবস্থান পুনর্বিবেচনা না করে, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে স্বপ্ন তারা দেখিয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যাবে। জামায়াতের সঙ্গে জোট হয়তো এনসিপিকে কিছু আসন এনে দেবে। কিন্তু সেই আসনের নিচে যদি আদর্শ না থাকে, তাহলে সেগুলো খুব বেশিদিন টিকে না। ইতিহাস এর সাক্ষী।
রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু আত্মপরিচয় বিসর্জন দিলে ইতিহাস ক্ষমা করে না। এনসিপি যদি এই পথেই হাঁটে, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে স্বপ্ন তারা বয়ে এনেছিল, তা ইতিহাসে একটি সুন্দর কিন্তু অসমাপ্ত অনুচ্ছেদ হয়েই থেকে যাবে। আর বাংলাদেশ রাজনীতি আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে—নতুন রাজনীতি এসেছিল, কিন্তু ঠিকানা খুঁজে পায়নি।
এ ইউ মাসুদ, শিক্ষক ও কলাম লেখক