‘আগে পুনর্বাসন, পরে উন্নয়ন; খাস জমির অধিকার ভূমিহীন জনতার’ এবং ‘ভূমিদস্যু হটাও, ভূমিহীন বাঁচাও’—এ স্লোগান সামনে রেখে রংপুরে সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রংপুরের ঐতিহাসিক পাবলিক লাইব্রেরি মাঠের শহীদ মিনার চত্বরে সংগঠনটির রংপুর জেলা ও মহানগর শাখার উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা ভূমিহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, খাসজমি উদ্ধার ও প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, “লুটপাট ও অর্থ পাচারের ব্যবস্থাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন বলা যায় না। জনগণের কর্মসংস্থান এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাই প্রকৃত উন্নয়ন। যারা দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করেছেন, তাঁদের বিচারে অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে এবং পাচার করা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ শাসক বা শোষক নন, এ দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। আমলাতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক যেসব আইন জনস্বার্থবিরোধী, সেগুলো বাতিল করে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শেখ নাসির উদ্দিন। তিনি ঢাকা শহরসহ সারা দেশের ভূমিহীন মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “ভূমিহীন মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রত্যেক ভূমিহীনকে ‘ভূমিহীন কার্ড’ দিতে হবে। জাতীয় সংসদে ভূমিহীনদের জন্য সংরক্ষিত আসন এবং একটি স্বাধীন ভূমি ও কৃষি সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের সহসভাপতি ও কৃষক নেতা কামরুজ্জামান টিপু বলেন, দেশের সব ভূমিহীন মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ পুনর্বাসন করতে হবে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিহীনদের যৌক্তিক দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে দেশব্যাপী আরও দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়ক ও সাংগঠনিক সম্পাদক কনক রহমান। তিনি রংপুর অঞ্চলের স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে বলেন, রংপুর বিভাগ ও জেলার ভূমিহীনদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ পুনর্বাসন করতে হবে। পাশাপাশি জেলায় শিল্প-কলকারখানা স্থাপন এবং কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা আমিন উদ্দিন বিএসসি, লালমনিরহাট জেলা শাখার আহ্বায়ক মো. আব্দুল হামিদ, গাইবান্ধা জেলা শাখার আহ্বায়ক মোছা. শাহীনুর বেগম এবং কুড়িগ্রাম জেলার কৃষক আন্দোলনের আহ্বায়ক মো. আরিফুল ইসলাম জুয়েল।
বক্তারা বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের খাসজমি বণ্টন কমিটিতে ভূমিহীনদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভূমিদস্যুদের দখলে থাকা খাসজমি উদ্ধার করে প্রকৃত ভূমিহীন ও কৃষকদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিতে হবে। এ ছাড়া বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে উপজেলাভিত্তিক সংসদীয় আসন নির্ধারণ, দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তাঁরা।
বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের রংপুর বিভাগের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রায়হান কবীরের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জেএসডি রংপুর মহানগর শাখার সভাপতি এবিএম মশিউর রহমান, রংপুর জেলা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল আলিম, যুগ্ম আহ্বায়ক হাসেম মুন্সি, সদস্যসচিব মোছা. ফাতেমা আখতার, যুগ্ম সদস্যসচিব মুশলেমুদ্দিন, মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মোছা. সামছুন্নাহার, যুগ্ম আহ্বায়ক লিলি বেগম, সদস্যসচিব সেলিম মিঞা এবং যুগ্ম সদস্যসচিব আয়শা বেগম। সমাবেশে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও ভূমিহীন মানুষ অংশ নেন।
সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল রংপুর শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন সংগঠনের নেতারা।
এফপি/মিব