পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত পার্বত্য জেলা বান্দরবান। পর্যটন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও নির্মাণসামগ্রীর সংকট, বাড়তি ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে জেলায় ইটভাটা স্থাপনের অনুমতি না থাকায় নির্মাণকাজে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দেশের অন্যান্য জেলায় ইটভাটা থাকলেও বান্দরবানে কেন থাকবে না? পরিবেশ সংরক্ষণ অবশ্যই জরুরি। তবে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ইট উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক, মাঝেরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ের মাটি ও গাছ সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, কেরানীহাটসহ বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ এসব এলাকার উৎপাদিত ইটই আবার বেশি দামে কিনে বান্দরবানে আনতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বান্দরবানে ইটভাটা না থাকার ফলে পরিবেশের প্রকৃত সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? যদি পাহাড়ের মাটি ও গাছ অন্য এলাকায় গিয়ে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এ নিষেধাজ্ঞার সুফল কারা পাচ্ছে আর ক্ষতির বোঝা বহন করছে কারা?
বান্দরবান সদর থেকে শুরু করে রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা—জেলার প্রতিটি উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণে ইটের প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকায় বাইরের জেলা থেকে ইট সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, সরবরাহসংকট ও বাজারমূল্যের কারণে নির্মাণকাজে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়িঘর নির্মাণ ও সংস্কার করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের মতে, বান্দরবানের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বাইরে থেকে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিনির্ভর স্থানীয় ইট উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নির্মাণ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইট উৎপাদন খাতের সঙ্গে শ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, গাড়িচালক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ জড়িত। স্থানীয়ভাবে ইটভাটা না থাকায় এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিকল্পিতভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার খুলতে পারে।
লামা উপজেলার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “নিজের বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে বাইরে থেকে ইট আনতে হয়। ইটের দাম, গাড়িভাড়া ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে নির্মাণব্যয় অনেক বেড়ে যায়। বান্দরবানে যদি পরিবেশের ক্ষতি না করে নিয়ম মেনে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।”
শ্রমিক বজলুল রশিদ বলেন, “কাজের সুযোগ থাকলে এলাকার মানুষকে বাইরে গিয়ে কাজ করতে হতো না। ইটভাটা চালু হলে শ্রমিক, গাড়িচালক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো কাজ আমরা চাই না।”
রুমা উপজেলার বাসিন্দা মংক্যাচিং মারমা বলেন, “আমাদের এলাকায় উন্নয়নকাজের পাশাপাশি মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণেও ইটের প্রয়োজন হয়। দূর থেকে ইট আনতে গিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। পরিবেশ রক্ষা করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য ভালো হতো।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী নোমান বলেন, “বান্দরবানে নির্মাণকাজের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু ইটের জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সরবরাহ ও দামের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে।”
বান্দরবানের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। জেলার কোন এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তুলনামূলক কম, কোথায় শিল্প স্থাপন করা সম্ভব এবং কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে—এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামাসহ পুরো জেলার উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয়ভাবে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
পরিবেশ রক্ষার নামে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সম্ভাবনা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, আবার উন্নয়নের নামে পাহাড়-প্রকৃতিও যেন ধ্বংস না হয়—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা, পাহাড় ও পরিবেশ সুরক্ষিত রেখেই গড়ে উঠবে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা।
এফপি/মিব