জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদের পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থল, পদায়নের যোগ্যতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং একটি বিশেষ মহলের সঙ্গে কথিত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদ বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ১৪ বছর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি শেরপুরের নকলা উপজেলার সরকারি হাজী জাল মামুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে প্রায় দুই বছর ১০ মাস দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাঁর এই পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, সরকারি কলেজের শ্রেণিবিন্যাস ও অধ্যক্ষ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে 'সি' ক্যাটাগরির কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সরাসরি 'এ' ক্যাটাগরির কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের বিধান প্রযোজ্য, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
এদিকে, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শওকত আলম মীর ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট অবসরোত্তর ছুটিতে যান। তবে অভিযোগ রয়েছে, তাঁর দায়িত্ব শেষ হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের ২১ জুলাই অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদকে ওই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এ ক্ষেত্রে পদায়নের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের আগে অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদের সঙ্গে একটি বিশেষ মহলের আর্থিক লেনদেন হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত অভিযোগের পক্ষে কয়েকটি ব্যাংক চেকের পাতা এবং ১০ লাখ টাকার একটি ঋণসংক্রান্ত চুক্তিপত্র থাকার কথা জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল তারিখসংবলিত প্রাইম ব্যাংকের জামালপুর শাখার একটি চেক বইয়ের কয়েকটি ফাঁকা পাতায় অধ্যাপক আব্দুল বার্সেদের স্বাক্ষর ছিল। পাশাপাশি তাঁর স্বাক্ষরিত ১০ লাখ টাকার একটি ঋণসংক্রান্ত চুক্তিপত্রও একটি বিশেষ মহলের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গত ১৫ সেপ্টেম্বর জামালপুরে আসেন। ওই দিন রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত জামালপুর পিটিআইয়ের সামনে মিজান ট্রেডার্সের একটি কক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
সে সময় সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের নামসংবলিত একটি গাড়ি প্রতিষ্ঠানটির সামনের সড়কে পার্ক করা ছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জামালপুরের নতুন বাইপাসসংলগ্ন দারুচিনি রেস্টুরেন্টে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আপ্যায়ন করা হয় বলে জানা গেছে।
তবে এসব আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে অধ্যক্ষের পদায়নের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নথি, চুক্তিপত্র এবং বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রয়োজন।
অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কলেজের চলমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমে তিনি অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন বলেও কয়েকটি সূত্র অভিযোগ করেছে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রকল্প, সিদ্ধান্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এদিকে, অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও পূর্ববর্তী সময়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করাকে এককভাবে রাজনৈতিক আনুগত্য বা অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তাঁর পদায়নের বৈধতা ও যোগ্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধিমালা এবং প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা জরুরি।
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক বিধিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে পদায়নসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন, কলেজের শ্রেণিবিন্যাস এবং অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া গেলে পদায়নসংক্রান্ত বিতর্কের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
এফপি/মিব