বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগাম প্রস্তুতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সার্বক্ষণিক নজরদারির ফলে এবার কোনো বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী বছরগুলোতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করতে দায়িত্ব পালন করায় পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার, গোয়েন্দা সংস্থা, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, গত ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা দেখা গেছে। তবে বর্তমান সরকার দেশকে সেই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, এবার কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। ডিজিটাল অ্যাপ ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৃণমূল থেকে বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে সম্ভাব্য দু-একটি নাশকতামূলক পরিকল্পনা আগেই শনাক্ত ও নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে এবার সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উৎসবকে আরও আনন্দমুখর করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আগে দুর্গাপূজায় সরকারি বরাদ্দ সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী এবার তা বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করেছেন।
এ ছাড়া প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য চালের বরাদ্দ ১০০ কেজি বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটিসহ এবার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা টানা পাঁচ দিনের ছুটি পেয়েছেন, যার মধ্যে তিন দিন ছিল সরকারি ছুটি।
এসব উদ্যোগকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গোপালগঞ্জ ও সাজেকের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
গোপালগঞ্জ সদরের খেয়াঘাটসংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন সদস্য টহলরত পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা চালান।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশের সদস্যসংখ্যা কম থাকায় তাঁরা হামলার মুখে পড়েন। তবে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে ইতিমধ্যে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের সাজেকের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সেখানে একাধিক ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়াসহ স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অতিরিক্ত ডিআইজির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা
পূজার ছুটির মধ্যে একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাসভবনে অভিযান এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮৫ জনকে সাজা দেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে তাঁকে ইতিমধ্যে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিভাগীয় মামলাসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং বিদেশে দেওয়া তাঁর বক্তব্য প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইন ও প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশকে একাধিকবার অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে নতুন করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়া কোনো পলাতক অপরাধীকে নতুন করে অপতৎপরতা চালানোর সুযোগ দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হবে
আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল রাজনৈতিক সমঝোতা ও আন্দোলনের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দেওয়া রায় সর্বোচ্চ আদালত বাতিল করেছেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ তৈরি হয়েছে।
সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে আইনসভার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এফপি/মিব