মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী এক তরুণী।
তাঁর দাবি, প্রেমিক রাজ্জাক মিয়া ও মামী মৌসুমী বেগমের প্ররোচনা ও হুমকির মুখে তিনি নানার বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন।
মামলার আসামির নাম তাইজুল ইসলাম। তিনি প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে কারাগারে রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গত রোববার (১১ অক্টোবর) কুলাউড়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নানার মুক্তি দাবি করে এসব কথা বলেন ওই তরুণী। তিনি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা হলেও বরমচাল ইউনিয়নের কালিয়ারঘর এলাকায় নানার বাড়িতে বসবাস করতেন। সেখানে নানা ও মামারা তাঁর দেখাশোনা করতেন বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তরুণী দাবি করেন, চলতি বছরের ১৮ মে তাঁকে প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। পরে গত ২৩ জুন তাঁর নানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়। তাঁর অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
তরুণীর ভাষ্য অনুযায়ী, কালিয়ারঘর এলাকার মবা মিয়ার ছেলে রাজ্জাক মিয়ার সঙ্গে তাঁর প্রায় এক বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একই সঙ্গে রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর মামী মৌসুমী বেগমেরও সম্পর্ক ছিল বলে তিনি দাবি করেন। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রাজ্জাক তাঁকে মামীর ঘরে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরে বিয়ের কথা বললে রাজ্জাক অস্বীকৃতি জানান এবং তাঁকে নানার বিরুদ্ধে মামলা করতে চাপ দেন বলে অভিযোগ করেন তরুণী।
তিনি আরও দাবি করেন, রাজ্জাক ও তাঁর মামী বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে নানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনতে বাধ্য করেন। থানায় নেওয়ার পর তিনি এসআই আল-আমিনকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। কিন্তু মামলায় রাজ্জাক ও মৌসুমীর নাম বাদ দিয়ে শুধু তাঁর নানা তাইজুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে এজাহার থেকে দুজনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন তরুণী। এ কাজে বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাজ্জাদুর রহমান সাজু সহযোগিতা করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য সাজ্জাদুর রহমান সাজু। তিনি বলেন, এলাকার বয়স্ক ব্যক্তি তাইজুল ইসলাম এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে তাঁর মনে হয় না। তাইজুলকে আটকের পর তাঁর ভাতিজা তাঁকে থানায় নিয়ে গেলে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। এজাহার থেকে রাজ্জাক ও মৌসুমীর নাম বাদ দিতে টাকা লেনদেনের অভিযোগ সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্নসংবাদ সম্মেলনে তরুণী মেডিকেল রিপোর্ট নিয়েও আপত্তি জানান। তাঁর দাবি, রিপোর্টটি সঠিক নয় এবং যাঁর বিরুদ্ধে তিনি ঘটনার অভিযোগ করেছেন, সেই রাজ্জাক এখনো আইনের আওতায় আসেননি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও আদালতের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
মৌলভীবাজার জজ কোর্টের এক আইনজীবী মেডিকেল রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানান, রিপোর্টে শরীরে আঘাতের চিহ্ন দঘড়ঃ ঋড়ঁহফ' উল্লেখ রয়েছে এবং যৌনাঙ্গের পরীক্ষায় 'ঐুসবহ ড়ষফ ঃবধৎ' লেখা আছে, যা পুরোনো ছিঁড়ে যাওয়ার চিহ্ন নির্দেশ করে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে এককভাবে ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে বা হয়নি—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মামলার অন্যান্য প্রমাণ, প্রাসঙ্গিক পরীক্ষার ফলাফল ও চিকিৎসকের চূড়ান্ত মতামত গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তরুণী জানান, তিনি ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালতে দুইবার জবানবন্দি দিয়েছেন এবং সেখানে তাঁর নানা নির্দোষ বলে জানিয়েছেন। নানার জামিনে তাঁর কোনো আপত্তি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া আদালতে একটি আপসনামা জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। আপসনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, আপসের ভিত্তিতে তাঁর কোনো অভিযোগ না থাকায় মামলাটি আইনগতভাবে নিষ্পত্তির বিষয়ে তাঁর সম্মতি রয়েছে। পাশাপাশি আপসের ভিত্তিতে দ্বিতীয় পক্ষের জামিনের বিষয়ে তাঁর আপত্তি নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্যমামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুলাউড়া থানার এসআই আল-আমিন বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট ও সাক্ষ্য - প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে তরুণী তাঁর নানার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। এখন তিনি ভিন্ন বক্তব্য দিলে তা বিবেচনার বিষয় বলে মন্তব্য করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এজাহার থেকে দুজনের নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, তরুণীর দেওয়া এজাহারের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে এবং মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আপসনামার বিষয়টি আদালত বিবেচনা করলে সে অনুযায়ী আইনগত সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও অভিযোগের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে মামলার প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।
এফপি/মিব