‘নয় বছর অনেক দীর্ঘ। আর কোনো অনির্দিষ্টকালীন বাস্তুচ্যুতি নয়। রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির এখনই সময়।’—জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে এমন আহ্বান জানিয়েছে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার জামতলী ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ইউসিআরের অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, প্রায় এক দশক ধরে নিজ মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশে শরণার্থীজীবন কাটাচ্ছেন তারা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে সংহতি জানিয়ে এলেও সংকট সমাধানে প্রত্যাশিত কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। তাই শুধু সহমর্মিতা ও প্রতিশ্রুতি নয়, প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, বিশ্বাসযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
তারা বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এর স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারেই করতে হবে। নাগরিকত্ব, মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অতীতে যে নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তা আর ফিরে আসবে না—এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফা প্রস্তাবকে স্বাগতইউসিআর এক বিবৃতিতে ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রথম প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় প্রস্তাবে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চতুর্থ প্রস্তাবে টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পঞ্চম প্রস্তাবে মাদক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
‘আলোচনা নয়, এখন কার্যকর পদক্ষেপ’মানববন্ধন ও সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে নিজ দেশে ফেরার পথ তৈরি হয়নি। ফলে শিবিরে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হচ্ছে।
ইউসিআরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৌলভী সাইদ উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করে আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের সময় এসেছে। রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল শিবিরে রেখে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মো. সোইব বলেন, প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গারা নিজ মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু আলোচনা নয়, মিয়ানমারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেন।
রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুবার কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো শিবিরেই রয়ে গেছি। তাই জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।’
রোহিঙ্গা নারী নেত্রী সাজিদা বেগম বলেন, ‘রোহিঙ্গা নারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত জীবনের নানা সংকট মোকাবিলা করছেন। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করা না হলে এই সংকট আরও দীর্ঘ হবে।’
‘নিজ দেশে ফিরতে চাই’১৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা নুরুজ্জামা বলেন, ‘আমরা নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চাই। দীর্ঘ নয় বছর ধরে বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবনযাপন করছি। বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু নিজেদের দেশ, ঘরবাড়ি ও স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে চাই। নিরাপদভাবে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’
রোহিঙ্গা নেতা মো. সালেহ বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক চাহিদার সংকটের মধ্যে বেড়ে উঠছে। এই অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’
রোহিঙ্গা নেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জাতিসংঘের চলমান অধিবেশনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে। বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত আদায় করতে হবে।’
নুর আলম বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বিষয় নয়; এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকট। দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। প্রত্যাবাসন ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
প্রত্যাবাসনের আগে অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায় রোহিঙ্গারাসমাবেশে বক্তারা বলেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতে যে নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তার পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে রয়েছেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ নয় বছরের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। তবে এই দায়িত্ব অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে মানবপাচার, মাদকপাচার, অভিবাসনসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে।
ইউসিআর বলেছে, প্রায় এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছে। এখন সেই সংহতিকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তি ও সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য, সময়সীমাবদ্ধ ও অধিকারভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরিতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
সংগঠনটির বক্তব্য, রোহিঙ্গারা স্থায়ীভাবে শরণার্থী হয়ে থাকতে চান না। তারা নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান।
এফপি/র