পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিভিন্ন অঙ্গীকার করা হয় এ দিনে! বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনে এবারের প্রতিপাদ্য “Inspired by Nature. For Climate. For Our Future” যা বাংলাদেশের বাস্তবতায় “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য”- স্লোগানে পালন করা হবে।
পৃথিবী আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরনই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের ভাগ্য। বিশ্বের এক প্রান্তে দাবানল, অন্য প্রান্তে ভয়াবহ বন্যা, কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ। প্রকৃতি আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, তার সহনশীলতারও একটা সীমা রয়েছে। বহু দশক ধরে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নির্বিচারে বন উজাড়, জলাভূমি ভরাট, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং প্রকৃতির ওপর মানুষের লাগামহীন হস্তক্ষেপ আজকের এই সংকটকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে।
এই বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েই চলছে। উপকূলে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার বিস্তার, উত্তরাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা এবং শহরাঞ্চলে পরিবেশগত অবক্ষয়ের পাশাপাশি যোগ হচ্ছে নতুন নতুন বিপর্যয়। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এর মারাত্মক প্রভাবগুলো সবসময় সরাসরি দেখা পাওয়া যায়না। আমরা ভাঙা ঘর দেখি, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা দেখি, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল দেখি। কিন্তু দেখতে পাই না সেই শিশুটিকে, যার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ ধীরে ধীরে অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন,আমাদের সন্তানেরা কেমন পৃথিবী পাবে?
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ,বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচালিত ‘নিরাপদ ভাসা’ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গভীর প্রভাবগুলো পড়ছে শিশুদের ওপর। তবে এই প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি নয়, ধারাবাহিক, আন্তঃসম্পর্কিত এবং প্রায় অদৃশ্য কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটছে। তীব্র তাপপ্রবাহে শিশুদের শারীরিক ঝুঁকি বাড়ে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়, আর দুর্যোগের সময় নিরাপদ পরিবেশের অভাবে শিশুদের নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়।
এবারের প্রতিপাদ্যে “প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা”- এর অর্থ হলো প্রকৃতিকে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখা, প্রকৃতির সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করা এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রকৃতি আমাদের সবচেয়ে বড় সহযোগী। সুন্দরবন উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। নদী, খাল-বিল, জলাভূমিসহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলো বন্যার চাপ কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, শহরের উন্মুক্ত সবুজ এলাকা সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ উন্নয়ন করতে গিয়ে আমরা এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছি। আজ আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছি, তার প্রভাব বহন করবে আগামী প্রজন্ম।
তাই পরিবেশ রক্ষার সাথে সাথে ন্যায়বিচার, উন্নয়ন এবং প্রজন্মগত দায়িত্বেরও অংশ হিসাবে সকল মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যখাত, উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষ- সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
নতুন করে ভাবতে হবে, আমরা কেমন উন্নয়ন চাই? কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা নগরায়ণই কি উন্নয়নের সূচক? নাকি একটি সুস্থ পরিবেশ, নিরাপদ শৈশব এবং জলবায়ু সহনশীল সমাজও উন্নয়নের সমান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান?
আমাদের নীতি, পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন উদ্যোগে শিশুদের সর্বাধিকার দিতে হবে। শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব, দেশ চালনার কর্মশক্তি। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; পরিপূরক। প্রতিটি শিশু যেখানে নিরাপদ, সুস্থ এবং বাসযোগ্য পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
প্রকৃতির কাছ থেকে শুধু সম্পদ নয়, প্রজ্ঞাও অর্জন করতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হবে আমাদের উন্নয়নের ভিত্তি। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি পরিবেশের নয়, ভবিষ্যতের। যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য দেখি।
এফপি/অ