Dhaka, Thursday | 7 May 2026
         
English Edition
   
Epaper | Thursday | 7 May 2026 | English
হাওরে ধানে পচনের গন্ধ, পানির নিচে কৃষকের হাজার কোটি টাকার স্বপ্ন
১৬ বছর বয়স পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে নোটিশ
একদিনের ব্যবধানে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম
বজ্রপাতের সময় জীবন বাঁচাতে পারে ‘৩০-৩০ নিয়ম’
শিরোনাম:

হাওরে ধানে পচনের গন্ধ, পানির নিচে কৃষকের হাজার কোটি টাকার স্বপ্ন

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৪:৪৬ পিএম  (ভিজিটর : ৩০)

বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যেখানে হাওরজুড়ে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধে কৃষকের উঠান মুখরিত থাকার কথা, সেখানে আজ বাতাসে ভাসছে পচা ধানের উৎকট গন্ধ। যে ধান কাটার উৎসব ঘিরে হাওরবাসীর রাত জেগে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, সেই উৎসব এবার পরিণত হয়েছে বিষাদে।

সুনামগঞ্জের দিরাই ও শাল্লার উদগল, ছায়ার হাওরসহ জেলার অধিকাংশ হাওর এখন রূপালি জলের নিচে ডুবে আছে। আর সেই পানির নিচেই তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার কোটি টাকার স্বপ্ন।

শাল্লা-মিলনবাজার সড়কে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দিরাই উপজেলার নাছিরপুর গ্রামের কৃষক আলী নূর ও তার স্ত্রী সৈয়দা নূর পচা ও অঙ্কুর গজানো ধান শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকায় কাটা ধানে গ্যাড়া (অঙ্কুর) গজিয়েছে। মাড়াই করা ধান শুকাতে দিলেই তা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে।

প্রান্তিক কৃষক আলী নূর বলেন, নয় কিয়ার জমি করছিলাম, চার কিয়ার কাটছি, বাকি সব ডুবছে। যা কাটছিলাম, হেইডাও ক্ষেতে ঝইরা গ্যাড়া আইয়া নষ্ট অইছে। আমি কৃষি ছাড়া আর কোনো কাজ জানি না। জমানো সব টাকা শেষ, এহন খোরাকির ধানটুকুও ঘরে উঠবো না।

একই দুর্দশার কথা জানান হাসিমপুর গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক জগৎ রায় ও মাঝারি কৃষক নিরাপদ দাস। প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬ কিয়ার জমিতে আবাদ করেছিলেন নিরাপদ দাস। কিন্তু তার অর্ধেকই এখন পানির নিচে। হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, বউ স্কুলের দপ্তরির চাকরি না করলে এই বছর না খাইয়া মরতে হইত।

অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণকে ক্ষতির অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন স্থানীয় কৃষকরা। শাল্লার চাকুয়া গ্রামের কৃষক কৃপেশ দাস ও রানু চন্দ্র দাস অভিযোগ করেন, জয়পুরের বেড়িবাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি নামতে না পেরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। রানু চন্দ্র বলেন, গত বছর এই বাঁধ ছিল না। এবার কেন দেওয়া হলো বুঝলাম না। সরকারি টাকার অপচয়ের পাশাপাশি আমাদের সর্বনাশও হইছে।

স্হানীয় কৃষকদের অভিযোগ আছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন নিয়েও উঠেছে স্বজনপ্রীতির। লৌলারচর গ্রামের কৃষক গণি মিয়া বলেন, উপজেলা থেকে অফিসাররা এসে মেম্বারদের কাছে তালিকা চায়, আর মেম্বাররা নিজেদের আত্মীয়দের নাম দেয়। আমরা চাই, সরকার মাঠে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের যাচাই করে সহায়তা দিক।

সরকারি তথ্য ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের দাবি, ইতোমধ্যে ৮৩ দশমিক ৮৪৩ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ তথ্যকে “ভুল ও বিভ্রান্তিকর” বলে মন্তব্য করেছেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক বর্তমান পরিস্থিতিকে “মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এসি রুমে বসে ধান কাটার যে কাল্পনিক পরিসংখ্যান দেওয়া হচ্ছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা। বাস্তবে হাওরের অর্ধেকের বেশি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত তথাকথিত বেড়িবাঁধ কৃষকের কোনো কাজে আসেনি। বরং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে পানি নামতে না পেরে ধান পচে গেছে। আমরা চাই, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হোক এবং দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। সরকারি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ মাত্র ২০ হাজার ১২০ হেক্টর। অথচ স্থানীয়দের দাবি, অতিবৃষ্টির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি।

এ বিষয়ে,সুনামগঞ্জ -১ আসনের সাংসদ  কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল হাওর পরিদর্শন করেছে এবং প্রশাসনকে সঠিক তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একসময় সোনালি ধানের ঢেউয়ে মুখর থাকা হাওর এখন যেন রূপালি জলের মাতমে স্তব্ধ। প্রকৃতির বৈরিতা, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার কারণে হাওরের অর্থনীতিতে নেমে এসেছে ভয়াবহ ধস। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের এই অন্নভাণ্ডার আগামী দিনে আরও বড় খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে।

এফপি/অ
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝