হাওর বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার এক নীরব ভরসা। এই অঞ্চলের বোরো ধান দেশের মোট চাল উৎপাদনের বড় অংশ জোগান দেয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অব্যবস্থাপনা, বাজার সিন্ডিকেট এবং নীতিগত ঘাটতির কারণে হাওরের কৃষক এক ধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে। সাম্প্রতিক সময়েও অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে, যা জাতীয় উৎপাদনেও ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
হাওরের কৃষি প্রকৃতিনির্ভর। বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো ধান। ফলে এই এক ফসলের ওপর নির্ভর করে কৃষকের পুরো জীবিকা। কিন্তু অকাল বন্যা, দুর্বল বাঁধ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় প্রায়ই পাকা ধান পানিতে ডুবে যায়। গবেষণা ও প্রতিবেদনগুলো বলছে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙনই অনেক সময় ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয় । প্রতি কয়েক বছর পরপর এই চিত্র পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ফসল রক্ষা করতে না পারার পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট হলো ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। বৃষ্টির সময় ধান শুকানোর জায়গা থাকে না, আধুনিক গুদামের অভাবে কাটা ধান নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে, সংগ্রহ করা ধান পর্যাপ্ত শুকানো ও সংরক্ষণের অভাবে পচে যাচ্ছে । ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করে দেয়, আর এই সুযোগে বাজারে সক্রিয় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট লাভবান হয়।
এই কারণে ধান সংগ্রহের মৌসুমে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে প্রান্তিক কৃষকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কৃষক ন্যায্যমূল্যে তার ফসল বিক্রি করতে পারে। একইসঙ্গে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া সম্ভব।
হাওরের কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়ে আসছেন। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল বাঁধের স্থায়ী সংস্কার ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আগাম বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এবং একটি সমন্বিত হাওর ব্যবস্থাপনা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন । এছাড়া কৃষিযান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো, পর্যাপ্ত হারভেস্টার সরবরাহ, এবং জরুরি সময়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থাও বারবার দাবি করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকরা সহজ শর্তে ঋণ না পেয়ে অনেক সময় চড়া সুদে ধার নেয়, যা তাদের আরও বিপদে ফেলে। তাই ‘শস্য বন্ধকি ঋণ’ চালু করা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল করা এবং ফসল বীমা চালুর দাবি বহুদিনের । এতে কৃষক অন্তত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবে।
এছাড়া জরুরি পরিস্থিতিতে নগদ সহায়তা, খাদ্য সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে দ্রুত পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে । কিন্তু এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক উদ্যোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে; দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো হাওরের উন্নয়নকে শুধু রাস্তা বা বড় প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলের প্রকৃতি, পানি প্রবাহ, কৃষি এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ হাওর শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি একটি সংবেদনশীল পরিবেশ-নির্ভর অর্থনীতি, যেখানে সামান্য নীতিগত ভুলও হাজার হাজার কৃষকের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কৃষক তার জমিকে শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখে না; এটি তার অস্তিত্ব, তার বেঁচে থাকার ভিত্তি। সেই ভিত্তি যখন বারবার ভেঙে পড়ে, তখন শুধু কৃষক নয় ঝুঁকিতে পড়ে পুরো দেশের খাদ্যব্যবস্থা। তাই হাওরের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে হলে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক এবং কৃষককেন্দ্রিক নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
লেখক: কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমন্বয়কারী, কৃষক উইং এনসিপি