নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায় টানা প্রায় ১৪ দিন ধরে ডিজেল তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েছেন ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা। একই সঙ্গে রবি মৌসুমে রবি শস্য মাড়াই ও ছোট ইঞ্জিনচালিত পরিবহনগুলোতেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এদিকে স্থানীয় কৃষকরা দ্রুত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মোট ৪ টি ডিলার পয়েন্টের মাধ্যমে কৃষকসহ সাধারণ মানুষ সরাসরি ডিজেল তেল সংগ্রহ করে থাকেন। অনেকেই আবার এলাকার ছোট খুচরা বিক্রেতা বা ফুঁড়ি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তেল সংগ্রহ করেন। এসব ফুঁড়ি ব্যবসায়ীরাও ডিলারদের কাছ থেকেই তেল নিয়ে বিক্রি করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ডিলাররা কোনো তেল পাচ্ছেন না। তাই তেল সরবরাহ করা ডিলার পয়েন্টগুলোতেও তেলের কোনো মজুদ নেই, ফলে পুরো উপজেলায় দেখা দিয়েছে তেলের তীব্র সংকট।
ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকদের সেচ পাম্প চালানো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। একই সঙ্গে স্যালো মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। এতে রবি মৌসুমের বিভিন্ন ফসল উত্তোলন ও মাড়াই কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরিবহন খাতে ব্যবহৃত ছোট ইঞ্জিনচালিত যানবাহনগুলোও তেলের অভাবে চলাচল করতে পারছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজকর্ম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বাগাতিপাড়া উপজেলায় চলতি মৌসুমে মোট ৫৬৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য ডিজেল চালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়াও রবি মৌসুমে-গম ৫ হাজার ২শত ৯০ হেক্টর, সরিষা ৪শত ৫০ হেক্টর, মসুর ৬শত ৬০ হেক্টর ও খেসারি ডাল ২শত ৯০ হেক্টর মাড়াইয়ের কাজও ডিজেলচালিত স্যালোমেশিনের ওপর নির্ভরশীল।
উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের কৃষক মালেক আলী (৪৫) বলেন, ধানের জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে তেল না পাওয়ায় সেচ পাম্প চালাতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে ধানের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, জেলা সদরে গিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। দুর থেকে তেল কিনে আনা আমাদের মতো প্রান্তিক কৃষকদের জন্য খুবই কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। আবার জমিতে রবি শস্য পেকে আছে, কিন্তু মাড়াই করার যন্ত্র চালানোর জন্যও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। সামনে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম, সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে না পারলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই দ্রুত তেল সরবরাহ করার জন্য কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কমনা করেন তিনি।
উপজেলার পৌরসভার মুরাদপুর এলাকার ছোট ইঞ্জিনচালিত গাড়িচালক শহিদুল ইসলাম (৩৭) বলেন,গাড়ির জন্য তেল পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা সদরের চারটি পাম্প ঘুরে মাত্র এক জায়গা থেকে ২ লিটার তেল পেয়েছি। অনেক সময় বিভিন্ন জায়গার খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাও সব জায়গায় পাওয়া যায় না। ফলে অনেক চালকই তেলের অভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ করে রেখেছেন।
উপজেলার বিহাড়কোল বাজারের তেলের ডিলার মেসার্স মন্ডল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ফজলুর রহমান (৫০) বলেন, প্রায় ১৪ দিন ধরে ডিজেল ও পেট্রোলবাহী গাড়ি না আসায় গ্রাহকদের তেল দিতে পারছেন না তিনি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে লিখিতভাবেও জানিয়েছেন। ইউএনও মহোদয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কাছেও চিঠির ফরোয়াডিং পাঠানো হয়েছে।আবার তার মাধ্যমে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট মহা-পরিচালক বরাবর লিখিত জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান বা আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ভবসিন্ধু রায় বলেন, ডিজেল সংকটের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে,তাঁরাও বিষয়টি অবগত আছেন।
বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, ডিজেল সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এফপি/অ