জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণিল আয়োজন, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও ঐতিহ্যবাহী নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘আদিবাসী উৎসব-২০২৬’। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সক্রিয় সহযোগিতায় এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ‘ইভেন্ট ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোর্সের অংশ হিসেবে আয়োজিত এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিল্প, সাহিত্য ও জীবনধারা তুলে ধরা। পাশাপাশি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বোঝাপড়া জোরদার করাও ছিল আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
সকালে আদিবাসী নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উৎসবের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইমদাদুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইসমত আরা ভূঁইয়া ইলা।
উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উন্নয়নকর্মী, লেখক ও গবেষক এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক-২০২৫ প্রাপ্ত ময়ূরা বিকাশ ত্রিপুরা, কবি ও সাহিত্যিক পরাগ রিছিল এবং বিরিশিরির পরিচালক প্রিংসন সাংমা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উৎসবে অংশ নেন।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে আদিবাসী শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে তাঁদের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র পরিচয় সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
বিকেলের পর্বে ছিল নানা বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক আয়োজন। এর মধ্যে ছিল আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খেলা, মারমা রূপকথা অবলম্বনে গল্প বলার আসর, আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, শব্দকুঞ্জ আবৃত্তি সংগঠনের আবৃত্তি, ড্রামা চেম্বারের নাটক এবং নজরুল ইউনিভার্সিটি ব্যান্ড মিউজিক সোসাইটির সংগীত পরিবেশনা।
উৎসবের কোর্স তত্ত্বাবধায়ক ও থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল হোসেন তোকদার বলেন, “ইভেন্ট ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্সের অংশ হিসেবে আয়োজনটি শুরু হলেও এটি এখন আর শুধু কোর্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বৃহত্তর আয়োজনে পরিণত হয়েছে। সবাই বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।”
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও আয়োজক আলভি মাহমুদ বলেন, “দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তবে এর উদ্দেশ্য কেবল একাডেমিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনাকে ধারণ করে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। পাশাপাশি আদিবাসীসহ প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাদের সাংস্কৃতিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলাও এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।”
আয়োজকদের মতে, এ উৎসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে বহুসাংস্কৃতিক চর্চা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতি জোরদারে ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এ উৎসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে।
এফপি/মিব