দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আমূল পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, ডায়ালাইসিস সুবিধা বৃদ্ধি, নতুন জনবল নিয়োগ এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন ও ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
উপজেলা হাসপাতাল হবে ১৫১ শয্যার
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, প্রতিটি ১৫১ শয্যার উপজেলা হাসপাতালে ১০টি করে ডায়ালাইসিস মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব হাসপাতালে স্থানীয় পর্যায়ে ২০ জন রোগীর ডায়ালাইসিস সেবা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া মাতৃসেবার জন্য ২০টি এবং নবজাতকদের জন্য ২০টি শয্যা রাখা হবে। নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক দুটি ফিজিওথেরাপি স্টেশন এবং উন্নত প্যাথলজি সেবার ব্যবস্থাও করা হবে।
উপজেলার পাশাপাশি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়েও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানান তিনি। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডরমিটরিসহ সাড়ে তিনতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ভবনে চিকিৎসকদের আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে। প্রকল্পগুলোর দরপত্র একই সময়ে আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে কমিউনিটি মেডিকেল ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রে মিডওয়াইফরা দায়িত্ব পালন করবেন।
কেন্দ্রগুলোতে নারীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তকরণ, রক্ত পরীক্ষা, জ্বর এবং উচ্চ ও নিম্ন রক্তচাপ পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। রোগীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হবে স্বাস্থ্যকার্ড। রোগের ধরন ও জটিলতা অনুযায়ী রোগীরা ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
ডায়ালাইসিস সেবায় বাড়ছে সক্ষমতা
দেশে ডায়ালাইসিস সেবার পরিধি বাড়ানোর অংশ হিসেবে এক হাজার ১০০টির বেশি মেশিনের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি এবং জেলা হাসপাতালে ১০টি করে ডায়ালাইসিস মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব জেলায় মেডিকেল কলেজ রয়েছে, সেখানে মোট ৬০টি এবং অন্যান্য জেলায় ১০টি করে মেশিন থাকবে।
ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও পাঁচজন রোবোটিক সার্জন আনার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
নিয়োগ দেওয়া হবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী
স্বাস্থ্য খাতে জনবলসংকট কমাতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী ১ নভেম্বর প্রায় সাড়ে ৪০০ চিকিৎসক কাজে যোগ দেবেন। আরও পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এ জন্য সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অংশ হিসেবে চলতি বছর ৪১ হাজার ৩৯১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এসব স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করবেন।
হাসপাতালের দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
সরকারি হাসপাতালের রোগীদের হয়রানি করে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি এ চক্রের বিস্তারের জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করেন।
মন্ত্রী বলেন, দালালচক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনরাও এ বিষয়ে কাজ করছেন। নিয়ম না মেনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও সিলগালা করা হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সরকার নতুন কোনো ক্লিনিকের অনুমোদন দেয়নি। সম্প্রতি কোনো ক্লিনিক চালু হয়ে থাকলে সেটির অনুমোদন আগে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
শর্ত পূরণ না করা ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। চিকিৎসক, ফার্মেসি ও অটোরিকশাচালকদের যোগসাজশে রোগীদের নির্দিষ্ট ওষুধ কিনতে বাধ্য করা কিংবা অন্য হাসপাতালে পাঠানোর অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথাও বলেন তিনি।
দুই বছরে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের আশা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রতিটি উপজেলায় ১৯ শয্যার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে সেগুলো ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এরপর স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাস পার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার সব ক্ষেত্রে মানোন্নয়ন করা সম্ভব নয়। বিগত সরকারের সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে আগামী দুই বছরের মধ্যে দুর্নীতিমুক্তভাবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে উন্নত পর্যায়ে নেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসার জন্য মানুষের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারি হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরবরাহ এবং ভালো ওষুধ বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এসব অনিয়ম বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সফরে আসার পথে কুমিল্লার মুরাদনগরে রোগীদের ওষুধ পাওয়ার বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান, জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ, পুলিশ সুপার মো. জালাল উদ্দিন ফাহিমসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এফপি/মিব