Dhaka, Wednesday | 28 October 2026
         
English Edition
   
Epaper | Wednesday | 28 October 2026 | English
শিরোনাম:

বাঞ্ছারামপুরে ৩০ কমিউনিটি ক্লিনিকের বেহাল দশা, ঝুঁকিতে সাড়ে ৩ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা

জরাজীর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা, ওষুধের সংকট; পরিত্যক্ত ক্লিনিকে মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগ

প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৩ পিএম  (ভিজিটর : ৬৯)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে। কোথাও ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ভাঙা দরজা-জানালা দিয়ে ঘটছে চুরির ঘটনা। রয়েছে ওষুধের সংকট, বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির অভাব এবং ব্যবহার অনুপযোগী শৌচাগার। কোনো কোনো ক্লিনিকের পরিত্যক্ত ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগও রয়েছে। এতে উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ছড়িয়ে থাকা এসব ক্লিনিকের বেশ কয়েকটির অবকাঠামোগত অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সেখানে রোগীদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও নিয়মিত তদারকির অভাবে ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব ক্লিনিক থেকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার কথা। প্রতিটি ক্লিনিক থেকে গড়ে সাত হাজার মানুষের সেবা পাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও জনবলসংকটের কারণে এ সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কোনো কোনো ক্লিনিকের দরজা-জানালা ভাঙা। কয়েকটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। কোথাও রোগীদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, আবার কোথাও শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। সুপেয় পানির সংকটও রয়েছে। জরাজীর্ণ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ওষুধ সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সমস্যার কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক রোগীদের দুর্ভোগ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে তাঁদের স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে কিনতে হচ্ছে।

ভাঙা ভবনে চিকিৎসাসেবা, আতঙ্কে রোগীরা
বাঞ্ছারামপুর সদর ইউনিয়নের সদর কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) শিরিন সুলতানা বলেন, তাঁর ক্লিনিকে একাধিকবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কয়েকবার ক্লিনিকের তালা ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে চান না। ফলে অনেক সময় বাইরে রোগীদের সেবা দিতে হয়।

শিরিন সুলতানা আরও বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করছেন তিনি। ক্লিনিকটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় পাঁচ বছর আগে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে।

এদিকে সদর ইউনিয়নের মনাইখালী কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন ভেঙে পড়ায় সেটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ওষুধের সংকট, নষ্ট শৌচাগার
বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা সালমা খাতুন বলেন, অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে ওষুধ নিতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্লিনিকের ভেতরের পরিবেশ দেখে ভয় পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘বাচ্চার খুব জ্বর। ওষুধ নিতে এসেছিলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ভয় লাগে। ছাদ থেকে সিমেন্টের টুকরা খসে পড়ে। বৃষ্টি হলে পানি চুইয়ে পড়ে, তখন দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন। আমরা গরিব মানুষ, শহরে গিয়ে চিকিৎসক দেখানোর সামর্থ্য নেই বলে এখানে আসি। কিন্তু এমন ভাঙা ঘরে চিকিৎসক ও রোগী—দুজনেরই জীবনের ঝুঁকি রয়েছে।’

ওষুধের সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ আর প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ পাওয়া যায় না। এসে শুনি সরবরাহ শেষ। তখন বাধ্য হয়ে গ্রামের ফার্মেসি থেকে ধারদেনা করে ওষুধ কিনতে হয়।

ছলিমাবাদ ইউনিয়নের একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা আজগর আলী বলেন, জ্বর নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসে তিনি বসার ভালো জায়গা পাননি। শৌচাগারটিও এত নোংরা যে ব্যবহার করা যায় না। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসক নিয়মিত পাওয়া যায় না; সপ্তাহে মাত্র এক দিন চিকিৎসক আসেন।

স্বাস্থ্যকর্মীদেরও নিরাপত্তাঝুঁকি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সিএইচসিপি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন। নিয়মিত তদারকির অভাব এবং সময়মতো ওষুধ সরবরাহ না হওয়ায় রোগীদের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় তাঁদের।

তাঁদের অভিযোগ, ক্লিনিকের তালা খোলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কাজও অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদেরই করতে হয়। পরিচ্ছন্নতার জন্য আলাদা কর্মী না থাকায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

২৫-২৬টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রঞ্জন বর্মন বলেন, উপজেলার ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ২৬টির ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র ও তালিকা পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ মূলত ট্রাস্টের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। বরাদ্দের ওষুধ শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী সরবরাহ আসার আগ পর্যন্ত কিছুটা সংকট দেখা দেয়। ৩০টি ক্লিনিকের মধ্যে দুটিতে সিএইচসিপি নেই। এতে রোগীদের সেবা পেতে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, পর্যায়ক্রমে অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কারকাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে পরিত্যক্ত ক্লিনিকের ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

দ্রুত সংস্কার ও কার্যকর তদারকির দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসা কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ না এলে উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে আরও ভোগান্তির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ, পরিত্যক্ত ক্লিনিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার মান ফিরিয়ে আনা হোক।

এফপি/মিব
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝