আয়োডিনের ঘাটতি দূর করতে আয়োডিনযুক্ত লবণের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বক্তারা।
বিশ্ব আয়োডিন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে ‘বুদ্ধিদীপ্ত জাতি গঠনে আয়োডিনের গুরুত্ব’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বিসিকের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, গেইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার, এনআই বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. এ কে এম মুসা এবং বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গুলজারুল আজিজ আয়োডিনের গুরুত্ব বিষয়ে উপস্থাপনা দেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, লবণ মিলমালিক, ভোক্তা এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আয়োডিনের ঘাটতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, দেশে এখনো প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ আয়োডিনের ঘাটতিতে ভুগছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এ সমস্যা সমাধানে আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার সর্বজনীন করা জরুরি।
তিনি বলেন, আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, উৎপাদকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নে বিসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতিমন্ত্রী মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে লবণ উৎপাদনকারীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উৎসাহ দেওয়ার জন্য বিসিকের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে আয়োডিনের ঘাটতি দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে বিসিকের উদ্যোগ
সভাপতির বক্তব্যে বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বলেন, লবণ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে দক্ষ জনবল তৈরি ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিসিক। সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, বিসিকের পরিচালনা পর্ষদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
আয়োডিনের অভাবে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আয়োডিন শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি অনুপুষ্টি উপাদান। স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ ও মানসিক সক্ষমতা বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়োডিনের ঘাটতিতে গলগণ্ডসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় গুরুতর ঘাটতি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বক্তারা জানান, ১৯৯০ সাল থেকে সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিসিকের মাধ্যমে সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ কার্যক্রমের আওতায় লবণ মিলের নিবন্ধন, পটাশিয়াম আয়োডেট সরবরাহ, আয়োডিনযুক্ত লবণের মান নিয়ন্ত্রণ, কারিগরি সহায়তা এবং লবণ মিল ও বাজার পর্যায়ে তদারকি করা হয়। পাশাপাশি আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বিসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করছে। সংস্থাটির দাবি, এ কার্যক্রমের ফলে দৃশ্যমান গলগণ্ড নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের অন্তত ৯০ শতাংশ পরিবার আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও দুই শতাংশ পরিবারকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের আওতায় আনতে হবে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
দেশের সব পরিবারের কাছে মানসম্মত আয়োডিনযুক্ত লবণ পৌঁছে দিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, উৎপাদনকারীদের সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বানের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভা শেষ হয়।
এফপি/মিব