নওগাঁর মান্দায় এক কিশোরীকে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করার অভিযোগ তুলে এক যুবককে হাত-পা বেঁধে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং জোরপূর্বক নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেকে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর আদালতেরও শরণাপন্ন হয়েছেন ভুক্তভোগী শিশ মোহাম্মদ ওরফে আল-মামুন (৩৪)।
নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা মামলাটির নম্বর ৬৮/২০২৬। ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ধারায় দায়ের করা মামলায় শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আইনগত প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মান্দা উপজেলার ২ নম্বর ভালাইন ইউনিয়নের বৈলশিং গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে মান্দা থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে একই গ্রামের আব্দুস সালাম (৬০), স্থানীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল মতিন মাল (৪৫), মিলন হোসেন (৩৫), আব্দুল লতিফ (৩২), নূরনবী (৪০), আরাফাত হোসেন (৩৫) ও মনজুর রহমান (৪০) এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে সাতজনকে অভিযুক্ত করেন শিশ মোহাম্মদ।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ অক্টোবর সকাল থেকে নিজের জমিতে সেচযন্ত্রের সাহায্যে সেচ দিচ্ছিলেন শিশ মোহাম্মদ। সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে প্রতিবেশী আব্দুস সালাম তাঁকে কৌশলে বাড়িতে ডেকে নেন। সেখানে আব্দুস সালামের নাতনিকে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করার অভিযোগ তোলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
শিশ মোহাম্মদ অভিযোগ অস্বীকার করলে উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁর কাছে টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
শিশ মোহাম্মদের অভিযোগ, একপর্যায়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে ১০০ টাকা মূল্যমানের একটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী শাকিলা আক্তারের মাধ্যমে বাড়ি থেকে জনতা ব্যাংকের সতিহাট শাখার একটি চেকের পাতা এনে তাতেও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে প্রাণনাশসহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর তিনি স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও সমাধান হয়নি বলে জানান তিনি। এরপর মান্দা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন এবং পরে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
শিশ মোহাম্মদ অভিযোগ করে বলেন, “স্থানীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল মতিন মাল তাঁর লোকজন নিয়ে জোরপূর্বক স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেকে স্বাক্ষর নিয়েছেন।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুস সালামের স্ত্রী জাহানারা বলেন, তাঁর নাতনিকে জোর করে জড়িয়ে ধরে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করায় শিশ মোহাম্মদকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে স্থানীয় চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, গ্রামবাসী ও চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল মতিন মালের সহযোগিতায় মেয়েটির ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানার পরিবর্তে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
ভালাইন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। তবে মেয়েপক্ষ আব্দুল মতিন মালকে ছাড়া সালিশে বসতে রাজি হয়নি। পরে আব্দুল মতিন মালের নেতৃত্বে মেয়েটির বিয়ের কথা বিবেচনা করে দুই লাখ ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে তিনি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল মতিন মাল বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান। তখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য, সাংবাদিকসহ শতাধিক গ্রামবাসী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিশ মোহাম্মদ ওরফে আল-মামুন অপরাধ স্বীকার করে টাকার পরিবর্তে স্বেচ্ছায় চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। শিশ মোহাম্মদের দাবি, তাঁকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের দাবি, স্থানীয় সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর দিয়েছেন।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফজাল হোসেন বলেন, “এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি আদালতেরও আশ্রয় নিয়েছেন শিশ মোহাম্মদ। আদালতে দায়ের করা মামলায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে আইনগত প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
এফপি/মিব