কুড়িগ্রামের চিলমারীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের আন্তঃউপজেলা বদলি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক নীতিগত অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলি কমিটির অনুমোদিত ১১ জন সহকারী শিক্ষকের বদলি আদেশের মধ্যে অন্তত ৮ জনের ক্ষেত্রেই নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এর ফলে কোনো কোনো বিদ্যালয় পুরোপুরি শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার ১৮ জন শিক্ষক আন্তঃউপজেলা বদলির আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে বদলি কমিটি ১১ জনের আবেদন অনুমোদন করে। তবে প্রাথমিক শিক্ষক বদলির বিদ্যমান নীতিমালায় ‘পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত থাকা বিদ্যালয় থেকে স্থানান্তরিত না করার’ স্পষ্ট বিধান থাকলেও চিলমারীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
গৌড়মোহনহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: চারটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র একজন শিক্ষক (মো. নুর আলম) কর্মরত ছিলেন। বদলি তালিকার ৫ নম্বর ক্রমিকে থাকা এই শিক্ষককে রাজারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করায় প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়েছে।
নটারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়: আটটি পদের বিপরীতে ছিলেন চারজন শিক্ষক। বদলি তালিকার ৩ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. বাবলু মিয়াকে স্থানান্তরিত করার পর বর্তমানে ২৩২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন।
মুদাফৎ কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫২ জন শিক্ষার্থীর জন্য নির্ধারিত ছয়টি পদের মধ্যে কর্মরত ছিলেন দুইজন শিক্ষক। বদলি তালিকার ১১ নম্বরে থাকা মোছা. মাসুমা আক্তারকে সরিয়ে নেওয়ায় এখন পুরো বিদ্যালয় সামলাতে হচ্ছে একা একজন শিক্ষককে।
উত্তর খাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি পদের বিপরীতে থাকা তিনজন শিক্ষকের একজন আগেই পিটিআই প্রশিক্ষণে ছিলেন। বদলি তালিকার ৯ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. মোবারক হোসেনকে বদলি করায় ৯০ জন শিক্ষার্থীর জন্য অবশিষ্ট রইলেন মাত্র একজন শিক্ষক।
ছালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫১ জন শিক্ষার্থীর জন্য চারজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছিলেন। বদলি তালিকার ৮ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. মনোয়ারুল ইসলামকে সরানোয় শিক্ষকসংখ্যা আরও কমেছে। এ ছাড়া ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা মো. জোনাব আলী (প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) এবং নাওশালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তামান্না ইসলাম তৃষাসহ অন্যান্য শিক্ষকের বদলিতে জ্যেষ্ঠতার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
চর মুদাফৎকালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) জিয়ারা খাতুন অভিযোগ করে বলেন,‘বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা একদমই মানা হয়নি। শিক্ষক নেতাদের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই অনিয়ম করা হয়েছে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে সংকট আরও তীব্র হলো।’
নিয়ম ভঙ্গের বিষয়ে জানতে চাইলে বদলি কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন,‘আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে একক শিক্ষক থাকা বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নতুন কেউ যোগদান না করা পর্যন্ত বর্তমান শিক্ষককে রিলিজ দেওয়া হবে না।’ জ্যেষ্ঠতার নিয়ম ভঙ্গের প্রশ্নে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী দায় এড়িয়ে বলেন,‘বদলি কমিটিতে জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন, যা বলার তারা বলবেন। তবে প্রতিষ্ঠান শূন্য রেখে বদলির কোনো বিধান নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বদলি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান দাবি করেন, ‘কোনো অনিয়ম হয়নি, আইন ও নীতিমালা মেনেই বদলি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।’
এফপি/অ