বয়স ৮০ বছর। এই বয়সে যেখানে সন্তান-সন্ততি ও স্বজনদের নিয়ে শেষ জীবনের সময় কাটানোর কথা, সেখানে আমীর উদ্দিন সরদারের দিন কাটছে একাকীত্ব আর অনিশ্চয়তায়। থাকার জন্য আছে ছোট্ট একটি টিনের ঘর। কিন্তু নেই আপনজন, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভরট্টো শিবনগর গ্রামের এই বৃদ্ধের জীবন যেন থেমে আছে অভাবের কাছে। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। কাজ করার সামর্থ্য নেই। তাই দুমুঠো খাবারের আশায় তাকে যেতে হয় মানুষের বাড়ি বাড়ি।
কেউ খাবার দিলে সেদিনের আহার জোটে। আবার কোনো দিন খালি হাতেই ফিরতে হয়।
আমীর উদ্দিন সরদার কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের দোয়ানী গ্রামের মৃত জমির উদ্দিন সরদারের ছেলে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। পরে তার মা কসব ইউনিয়নের চকবালু গ্রামের মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। মায়ের সঙ্গে থেকেই বড় হন আমীর উদ্দিন।
জীবনের এক পর্যায়ে নিজের একটি সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণে একে একে তিনবার বিয়েও করেন। বনকুড়া, পারডাঙ্গী ও চকত এলাকায় সংসার গড়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—কোনো সংসারই স্থায়ী হয়নি।
একসময় স্ত্রী-সংসার হারিয়ে একেবারেই একা হয়ে পড়েন তিনি। জীবিকার স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না থাকায় শুরু হয় অনিশ্চিত জীবন। এর মধ্যে আত্রাই নদীর ভাঙনে হারিয়ে যায় তার বসতভিটাও।
মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে একসময় জোঁকাহাট-সংলগ্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদে যাতায়াতের রাস্তার পাশে একটি ছইয়ের নিচে বসবাস শুরু করেন আমীর উদ্দিন।
ভরট্টো শিবনগর গ্রামের আলহাজ্ব মজিবর রহমান বলেন, ‘আমীর উদ্দিনের এই পৃথিবীতে কেউ নেই। বাড়িঘর আত্রাই নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর তার মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না। পরে রাস্তার পাশে ছইয়ের নিচে বসবাস শুরু করেন।’
তিনি বলেন, পরে ‘১৯ কুড়ি স্বেচ্ছাসেবী’ সংগঠনের পক্ষ থেকে ভরট্টো শিবনগর এলাকায় রুস্তমের দোকানের কাছে একটি সেডের ওপর টিনের বেড়া দিয়ে ছোট একটি ঘর করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানেই কোনো রকমে বসবাস করছেন তিনি। সরকারি অনুদান অথবা একটি ভালো বাড়ির ব্যবস্থা করা হলে তিনি অনেক উপকৃত হতেন।
ছোট্ট ওই ঘরটিই এখন আমীর উদ্দিনের ঠিকানা। ঘরে নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা, নেই প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে মানুষের আশপাশে। আর সন্ধ্যা নামলে ফিরে আসেন নিজের সেই ছোট্ট আশ্রয়ে।
তবে ঘর থাকলেও তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা খাবার নিয়ে। বয়সের কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। তাই প্রতিদিন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করতে হয় তাকে।
‘১৯ কুড়ি স্বেচ্ছাসেবী’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, মানবিক কারণে আমীর উদ্দিনকে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করি অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
তিনি বলেন, ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ সমাজের বিত্তবানদের এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’
জীবনের শেষ সময়ে এসে আমীর উদ্দিনের চাওয়া খুব বেশি নয়। একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত খাবার আর মানুষের একটু সহানুভূতি—এটুকুই তার প্রয়োজন।
এফপি/অ