ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে প্রায় ১৬ মাস স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একসঙ্গে সংসার করার পর স্ত্রীকে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রবিউল ইসলাম রবি (২৬) নামে এক ভ্যানচালক বর্তমানে জেলা কারাগারে রয়েছেন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়।
তবে ঘটনাটি ঘিরে সামনে এসেছে ভিন্ন তথ্য ও একাধিক প্রশ্ন। রবির পরিবারের দাবি, দুই পরিবারের উপস্থিতি ও সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটির বাবার বাড়িতে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে দুজনের একসঙ্গে তোলা একাধিক ছবি রয়েছে বলেও দাবি তাদের।
অন্যদিকে রবির স্ত্রী ইতির পরিবারের পক্ষ থেকেও দুই এলাকায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তাদের দাবি, ওই বিয়ের কোনো কাগজপত্র বা কাবিননামা তাদের দেওয়া হয়নি। ইতির বড় বোন পরিচয় দেওয়া এক নারী অভিযোগ করেন, রবি তার ছোট বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ান এবং পরে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
ঘটনাটি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর বারোবাজার ইউনিয়নের লুচিয়া গ্রামের। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন। ফলে উভয় পক্ষের অভিযোগ, কথিত বিয়ের প্রকৃতি এবং মামলার অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
গ্রেপ্তার রবিউল ইসলাম রবি লুচিয়া গ্রামের ভ্যানচালক শুকুর আলীর ছেলে। তিনি ভ্যান চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারে মৌসুমি ফলের শরবত বিক্রি করতেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে ইতি খাতুনের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে রবির পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাদীর অভিযোগ, গত বছরের ২৫ আগস্ট বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে কালীগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।
পরে রবির বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে অবস্থান করার সময় কাবিননামা ও বিয়ের কাগজপত্র চাইলে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে রবির বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় ইতি খাতুন ঝিনাইদহ আদালতে মামলা করলে আদালত সেটি কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কালীগঞ্জ থানায় মামলা নম্বর-১১ ও জিআর-১৭১/২৬ হিসেবে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।
মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর গত ২৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ১টার দিকে বারোবাজার পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল লুচিয়া গ্রামে রবির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে বাদী ইতির বয়স নিয়ে। পরিবারের দেওয়া জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ইতির বর্তমান বয়স ১৫ বছর ১ মাস। তবে মামলার এজাহারে তার বয়স ১৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার সঙ্গে সংঘটিত কথিত বিয়ের আইনগত বৈধতা এবং ঘটনার অন্যান্য বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বয়স সংক্রান্ত সরকারি নথি, ঘটনার সময়কাল ও বিয়ের দাবির প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হবে।
রবির পিতা শুকুর আলী মামলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ফেসবুকে পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার দাবি, মেয়ের পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতেন এবং পরে উভয় পরিবারের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইতির বাবার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়।
তিনি বলেন, মেয়ের বয়স কম থাকায় আইনি জটিলতার কথা চিন্তা করে কাবিননামা করা হয়নি। স্থানীয় এক ধর্মীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল। এরপর প্রায় ১৬ মাস তারা সংসার করেছে। দুই পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াতও ছিল।
শুকুর আলী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। বাবা-ছেলে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। আমার ছেলের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
রবির পরিবারের কাছে কথিত বিয়ের অনুষ্ঠানের একাধিক ছবি এবং বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে ইতি ও রবির একসঙ্গে তোলা ছবি রয়েছে। ছবিগুলো পরিবারের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদককে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ছবিগুলোর তারিখ, স্থান ও ডিজিটাল তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ দাবি করেন, তিনি কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে রবির বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন। রবির বন্ধু রনির দাবি, প্রায় ৫০ জন বরযাত্রী নিয়ে তারা সেখানে গিয়েছিলেন এবং দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল।
লুচিয়া গ্রামের গৃহবধূ পারভীনা বেগম বলেন, সংসারের কাজ নিয়ে ইতির সঙ্গে তার শাশুড়ির কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। পরে ইতির নানি তাকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর পুলিশ রবিকে গ্রেপ্তার করার পর মামলার বিষয়টি জানতে পারেন বলে তিনি দাবি করেন।
রবির পরিবারের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ সদস্যদের কাছে পরোয়ানা দেখতে চাওয়া হলেও তা দেখানো হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে ইতির বাবা আবুল কাশেমের ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ইতির বড় বোন পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, তাদের এলাকায় এবং রবির বাড়ির এলাকাতেও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়েছিল। তবে ওই বিয়ের কোনো কাগজপত্র তাদের দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে বিয়ে হয়েছিল, আবার তাদের ওখানেও বিয়ে হয়েছে। কিন্তু বিয়ের কোনো কাগজপত্র আমাদের দেয়নি।
তার অভিযোগ, রবি তার ছোট বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ান এবং পরে রবির পরিবারের সদস্যরা ইতির ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তারা আদালতে মামলা করেন বলে জানান তিনি।
বাদী ইতি খাতুনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি পারিবারিক বিষয় এবং তিনি এ বিষয়ে আর কথা বলতে চান না।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, ইতি খাতুন আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করলে আদালত সেটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলাটি নথিভুক্ত করে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাদীর বয়সের বিষয়ে তিনি বলেন, বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে রবিউল ইসলাম রবি আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা, বাদীর বয়স, কথিত বিয়ের বাস্তবতা এবং উভয় পক্ষের অভিযোগের সত্যতা উদঘাটিত হবে।
এফপি/ফ