সিলেটের ওসমানীনগর অংশে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটম চলাচল নিষিদ্ধ হলেও তা মানছেন না কেউ। উপজেলার বিভিন্ন বাজারে গড়ে উঠেছে একাধিক অবৈধ সিএনজি ও টমটম স্ট্যান্ড। মহাসড়কের ওপর যত্রতত্র পার্কিং, ভাসমান দোকান, বাজারকেন্দ্রিক যানজট, বেপরোয়া গতি এবং সড়কের বেহাল দশায় প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা।
সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট দুপুরে উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম এলাকায় তেলবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ৩ জনসহ মোট চারজন নিহত হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকাগামী পদ্মা তেলবাহী ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ঢ ৪৪-০৬৫৪) উল্টো পথে গিয়ে সিএনজি অটোরিকশা (মৌলভীবাজার-থ ১১-৮৩৫৩) কে সামনে থেকে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন মারা যান। আহত আরও ছয়জনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আরও তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে গত ৭ আগস্ট উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হন। সব মিলিয়ে গত ১৫ দিনে ওসমানীনগর অংশে চারটি দুর্ঘটনায় ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত মানুষ।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে দেশের সব মহাসড়কে অটোরিকশাসহ তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে সরকার। কিন্তু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে সেই নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে।
উপজেলার উনিশ মাইল, গোয়ালাবাজার, তাজপুর, কদমতলা, দয়ামীর, কুরুয়া ও নাজিরবাজার এলাকায় মহাসড়কের পাশে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটম রেখে স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি বাজারে দুই থেকে চারটি করে এমন স্ট্যান্ড রয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে অনেকেই খুলে বসেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেরামতের দোকান।
মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চালকদের তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও ঘুমকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ভোর ও সকালে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। অনেক সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় চালকরা স্টিয়ারিংয়ে বসেই ঢলে পড়েন। এর সঙ্গে যত্রতত্র পার্কিং, বাজার ও মহাসড়কের পাশে ভাসমান দোকান এবং হাটবাজারকেন্দ্রিক যানজট দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
এছাড়া মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশের সংকীর্ণ ও বেহাল রাস্তা, ভারী ও দূরপাল্লার যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং নিষিদ্ধ ও ধীরগতির সিএনজি, ইজিবাইক ও টমটমের অবাধ চলাচলকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচলের বৈধতা আছে কি না জানতে চাইলে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিছুর রহমান বলেন, সিএনজি তো মহাসড়কে চলাচলের কোনো বৈধতা নাই।
বৈধতা না থাকলে কীভাবে এসব যান মহাসড়কে চলছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিএনজি কীভাবে চলছে সেটা তো আমি বলতে পারবো না। সিএনজি রাস্তায় চলছে, এটা তো একটা বড় সমস্যা। সিএনজি তো আর একটা না। একাধিক সিএনজি, একাধিক সংগঠন, একাধিক মহাসড়কে চলছে। আমরা যতটুকু পারছি নিয়মিত প্রসিকিউশন দাখিল করছি। নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, নাজিরবাজার থেকে শেরপুর পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়কে প্রায় ১৯টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান রয়েছে। এসব স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। একই স্থানে একাধিকবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলে এসব স্থান স্থানীয়দের কাছে ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
গত ৭ আগস্ট কাশিকাপন এলাকায় ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনার পর ৮ আগস্ট রাতে নিহত সাদমান জাহাঙ্গীর সৌরভের বড় ভাই মো. মনিরুল ইসলাম বাদী হয়ে দুই বাসের চালককে আসামি করে ওসমানীনগর থানায় মামলা করেন। মামলার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে, দূর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ দিনের মধ্যে দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা হয়নি। গত ১৩ আগস্ট প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক ধীরগতির কারণেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে সড়ক বিভাগের মতামত লাগবে। তাদের মতামত পাইনি। তারাও কমিটির সদস্য। জেলা প্রশাসক মহোদয় আরেকটি কমিটি করে দিয়েছেন। ওই কমিটির সঙ্গে সুপারিশ প্রেরণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, শনিবার ব্রাহ্মণগ্রামে দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ থাকায় গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও ঘটছে। শুষ্ক মৌসুমে গর্ত ও ধুলাবালি এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। এর পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয় লেন নির্মাণকাজ ধীরগতিতে চলায় বিভিন্ন স্থানে যান চলাচলে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ চলমান রয়েছে। প্রজেক্ট কর্তৃপক্ষকে দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা, জনসচেতনতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গতি, মহাসড়কে নিষিদ্ধ যান চলাচল এবং অব্যবস্থাপনার কারণে ওসমানীনগর অংশটি এখন একের পর এক 'মৃত্যুর ফাঁদে' পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাগুলো চিহ্নিত হলেও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে।
তাদের মতে, মহাসড়কে নিষিদ্ধ সিএনজি-টমটম চলাচল ও অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা, যানবাহনের ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা এবং বেপরোয়া গতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। দ্রুত এসব ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।
এফপি/অ