Dhaka, Wednesday | 28 October 2026
         
English Edition
   
Epaper | Wednesday | 28 October 2026 | English
শিরোনাম:

দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে: চাই স্পষ্ট ও ন্যায্য আইন

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দেশের গণতন্ত্রে কাজে লাগানোর সময় এসেছে

প্রকাশ: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৫ এএম  (ভিজিটর : ১৭)

বাংলাদেশের লাখ লাখ নাগরিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। তাঁদের অনেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেও বাংলাদেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। তাঁরা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন, বিনিয়োগ করছেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং দেশের উন্নয়নে নানা ধরনের অবদান রাখছেন। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ কতটা বিস্তৃত?

বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা বিদেশে স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনসেবায় কাজে লাগানোর সুযোগ থাকা উচিত।

আমার বক্তব্য স্পষ্ট—দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও জনসেবা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট, ন্যায্য ও আধুনিক আইন।

ব্রিটেনে সুযোগ থাকলে বাংলাদেশে বাধা কেন?

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকেরা স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। অনেকে কাউন্সিলর ও মেয়র হয়েছেন, কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখায়, ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় কিংবা আন্তর্জাতিক পটভূমি জনসেবার পথে অনিবার্য বাধা নয়।

তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে নাগরিকত্বের সম্পর্ক বজায় রাখা একজন যোগ্য ব্যক্তি কেন নিজের দেশে জনসেবায় অংশ নিতে পারবেন না?

অবশ্য যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং নির্বাচনী যোগ্যতার আইন এক নয়। তাই ব্রিটেনের ব্যবস্থা সরাসরি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের আইনকে আরও বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী করা অবশ্যই সম্ভব।

আমাদের বিবেচনা করা উচিত একজন ব্যক্তি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যোগ্য কি না, তাঁর কোনো প্রকৃত স্বার্থের সংঘাত রয়েছে কি না এবং তিনি দায়িত্ব পালনে কতটা সক্ষম। শুধু দ্বিতীয় নাগরিকত্বের পরিচয়কে সব ক্ষেত্রে অযোগ্যতার মাপকাঠি বানানো যুক্তিসংগত নয়।

প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর উৎস নন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের অবদানকে শুধু রেমিট্যান্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না।

বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রশাসন, চিকিৎসা, আইন, শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, ব্যাংকিং ও স্থানীয় সরকারে কাজ করে মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। তাঁদের অনেকের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সুশাসনে কাজে লাগতে পারে।

প্রবাসীরা যদি দেশে ফিরে তাঁদের নিজ এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চান, স্থানীয় সরকারে নেতৃত্ব দিতে চান কিংবা জাতীয় পর্যায়ে জননীতিতে অবদান রাখতে চান, তাহলে তাঁদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের উচিত প্রবাসীদের শুধু অর্থনৈতিক অবদানের জন্য নয়, তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও নেতৃত্বের জন্যও মূল্যায়ন করা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সুযোগ সম্প্রসারণ করা হোক

দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সংস্কারের আলোচনা শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিক সেবা, জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামো এবং নগর ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে স্থানীয় সরকারে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন কোনো বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরে জনসেবা করতে চাইলে তাঁর যোগ্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা উচিত। শুধু দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার কারণে তাঁকে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে আইনগত যোগ্যতা, দায়বদ্ধতা ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আমার প্রস্তাব, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী বাংলাদেশিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য বর্তমান আইন পর্যালোচনা করা হোক। প্রয়োজন হলে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাংবিধানিক স্পষ্টতা জরুরি

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণ করে। বিদেশি নাগরিকত্ব ও বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নও এই সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর প্রশ্নে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। বর্তমান বিধানে যেখানে বাধা রয়েছে, সেখানে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ায় আলোচনা হতে পারে।

একই সঙ্গে প্রার্থী বাছাই ও যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। নির্বাচনের আগে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচন কমিশনের কাছে যোগ্যতার শর্ত পরিষ্কার থাকা উচিত।

এতে নির্বাচনের পরে অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক কমবে এবং ভোটারদের আস্থা বাড়বে।

সব সরকারি পদের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে না

দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের জনসেবার সুযোগ দেওয়ার অর্থ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উপেক্ষা করা নয়। প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং নির্দিষ্ট জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক পদে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু এসব পদে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রেও যুক্তিসংগত ও স্পষ্ট আইন থাকা উচিত। কোন পদে কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, কোথায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই হবে এবং কীভাবে স্বার্থের সংঘাত মোকাবিলা করা হবে—এসব আগে থেকেই নির্ধারিত থাকা দরকার।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দায়িত্ব এক নয়। তাই পদভেদে পৃথক শর্ত থাকতে পারে।

আমার প্রস্তাব কোনো শর্তহীন অনুমতির পক্ষে নয়। আমি এমন একটি ব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা থাকবে না, আবার রাষ্ট্রের প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকিও উপেক্ষিত হবে না।

দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

দ্বৈত নাগরিকদের জন্য একটি আধুনিক আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রার্থীর নাগরিকত্বের অবস্থা প্রকাশ করতে হবে। প্রাসঙ্গিক বিদেশি সরকারি দায়বদ্ধতা ও আর্থিক স্বার্থের তথ্য জানাতে হবে। স্বার্থের সংঘাত থাকলে তা শনাক্ত ও মোকাবিলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সবার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

একই সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ও বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ থাকতে হবে।

এভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং যোগ্য নাগরিকদের অযথা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।

রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, আইনই হোক চূড়ান্ত

দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দেখা উচিত নয়। আজ যে নিয়ম একজনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে, আগামীকাল একই পরিস্থিতিতে অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হতে হবে।

সরকার, বিরোধী দল, নির্বাচন কমিশন, আইনজ্ঞ, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে এ বিষয়ে একটি স্থায়ী নীতি প্রণয়ন করা দরকার।

আইন যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। আর যদি আইন রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে আবেগনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে তথ্য, আইন ও সাংবিধানিক নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

পাসপোর্টের সংখ্যা নয়, যোগ্যতাই হোক বিবেচ্য

বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। তাঁদের অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশের মানুষের কাজে লাগাতে চান। তাঁদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

দ্বৈত নাগরিকত্বধারী বাংলাদেশিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সরকারি দায়িত্ব পালনের সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য সরকারি পদের ক্ষেত্রে বর্তমান আইন পর্যালোচনা করে কোথায় সুযোগ বাড়ানো যায় এবং কোথায় বিশেষ শর্ত প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা উচিত।

আমার অবস্থান পরিষ্কার: যোগ্য নাগরিককে শুধু দ্বিতীয় নাগরিকত্বের কারণে জনসেবা থেকে দূরে রাখা উচিত নয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সাংবিধানিক বিধান ও জনস্বার্থের প্রয়োজনীয় সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—একজন মানুষের কয়টি পাসপোর্ট আছে। প্রশ্ন হওয়া উচিত—তিনি আইন অনুযায়ী যোগ্য কি না, তাঁর কোনো প্রকৃত স্বার্থের সংঘাত রয়েছে কি না এবং তিনি সততা ও জবাবদিহির সঙ্গে জনসেবার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন কি না।

বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেও প্রবাসী নাগরিকদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে পারে। নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে স্পষ্ট নিয়ম, সন্দেহের পরিবর্তে স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যের পরিবর্তে ন্যায্য সুযোগ—এই নীতিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

এফপি/অ
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝