পিরোজপুরের নেছারাবাদে প্রায় ৬০ বছর ধরে পূজা-অর্চনা হয়ে আসা দক্ষিণপাড়া সার্বজনীন শীতলা মন্দিরের ৪২ শতক জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জামায়াত নেতা মো. শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি জমিটি দখলে নিয়ে সেখানে ধান চাষ করছেন। মন্দিরের জমি উদ্ধার করে পুনরায় পূজা-অর্চনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন জমিদাতা পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা।
অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম হাওলাদার নেছারাবাদ উপজেলার ৮ নম্বর সমুদয়কাঠী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। তিনি ওই এলাকার মৃত আব্দুর রহমান হাওলাদারের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সমুদয়কাঠী গ্রামের দক্ষিণপাড়া সার্বজনীন শীতলা মন্দিরের নামে ৪২ শতক জমি রয়েছে। জমিটির দাগ নম্বর ৯৫২ এবং খতিয়ান নম্বর ১৩০। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দশক ধরে ওই জমিতে শীতলা পূজা-অর্চনা হয়ে আসছিল। সর্বশেষ বিএস রেকর্ডেও জমিটি আটজন শরিকের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আট শরিকের একজনের অংশের বিষয়ে একটি অনিবন্ধিত বায়নাচুক্তির ভিত্তিতে জমিটির ওপর দাবি প্রতিষ্ঠা করেন শফিকুল ইসলাম হাওলাদার। ওই শরিক বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। পরে জমিটি দখলে নিয়ে সেখানে ধান চাষ শুরু করা হয়। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী জমির মালিক ননী লাল বিশ্বাসের ছেলে মনোজ বিশ্বাস বলেন, “সর্বশেষ হালনাগাদ বিএস রেকর্ড অনুযায়ী জমিটি আটজন শরিকের নামে রেকর্ড করা হয়েছে। শফিকুল ইসলাম হাওলাদার একটি অনিবন্ধিত বায়নাচুক্তি দেখিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তিনি ৫ আগস্টের পর জমিটি দখলে নিয়ে ধান চাষ করছেন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা দীর্ঘদিন ধরে এই জমিতে শীতলা পূজা করে আসছেন। আমরা জমিটি উদ্ধার করে আগের মতো পূজা-অর্চনা চালু করতে চাই।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য সুমন আইচ বলেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁরা ওই জমিতে শীতলা পূজা হতে দেখে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর স্থানীয় জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম হাওলাদার জমিটি দখল করেছেন। জমির প্রকৃত কাগজপত্র নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন সুমন আইচ।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা একাধিকবার বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছেন। অভিযুক্তের কাছে জমির বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাওয়া হলেও তিনি তা দেখাতে আগ্রহী হননি বলে দাবি করেন এই ইউপি সদস্য। তাঁর মতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত জমি নিয়ে এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।
অভিযোগের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বক্তব্য জানতে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি। পরে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে জমির মালিকানা ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমুদয়কাঠী ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মো. আবু হানিফ বলেন, শফিকুল ইসলাম হাওলাদার ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে জমিসংক্রান্ত বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বার্থে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ জমি দখল করলে তার দায় দল নেবে না। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের পিরোজপুর জেলা শাখার সদস্যসচিব প্রলয় মন্ডল বলেন, সমুদয়কাঠীতে জমি দখল, ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুর ও সংখ্যালঘুদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ পেয়ে তাঁরা সরেজমিনে গিয়েছিলেন। সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম হাওলাদার তাতে কর্ণপাত করেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রলয় মন্ডল আরও বলেন, সমুদয়কাঠী এলাকার ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পিরোজপুর জেলা প্রশাসন, নেছারাবাদ উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান তিনি।
এফপি/অ