কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন পর্যটন ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষায় উচ্ছেদের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ মালিকেরা। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া, সরকারি অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাসহ আট দফা দাবি তুলে ধরেছেন তাঁরা।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বৃহত্তর মেরিন ড্রাইভ রোড রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা এসব দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে টুপটুপ ট্র্যাজেডির অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ পর্যটকের প্রতি গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ী নেতারা।
লিখিত বক্তব্যে তাঁরা বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ীরা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের প্রতিপক্ষ নন। বরং পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে চান। কোনো প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত, অগ্নিনিরাপত্তা বা পরিচালনাগত ত্রুটি থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া উচিত।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, সমস্যার সমাধান না করে প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া বা উচ্ছেদ করা হলে শুধু উদ্যোক্তারাই নন, সেখানে কর্মরত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে।
সমিতির দাবি, হিমছড়ি, পেঁচার দ্বীপ, সোনারপাড়া, ইনানী ও পাটোয়ারটেকসহ মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৫০০টি রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাঁদের বড় একটি অংশ স্থানীয় বাসিন্দা।
রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর কর্মীদের পাশাপাশি টমটমচালক, ফটোগ্রাফার, বিচ চেয়ার ও বাইকসেবাদাতা, ঘোড়ায় ভ্রমণসেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং স্থানীয় পণ্য সরবরাহকারীদের আয়ও পর্যটন কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল বলে জানান তাঁরা।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, পর্যটন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান তাঁরা।
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত ও ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার দাবি
টুপটুপ ট্র্যাজেডির প্রসঙ্গ তুলে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ওই ঘটনা পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ এবং অতিথিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
তাঁরা ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানমালিক, ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের নিয়মিত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের দাবি জানান। একই সঙ্গে রেস্তোরাঁকর্মীদের নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ব্যবসায়ীরা বলেন, অনেক উদ্যোক্তার পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেই। ফলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিন পরিদর্শন করে ত্রুটিগুলো লিখিতভাবে জানালে এবং সংশোধনের জন্য যৌক্তিক সময় নির্ধারণ করে দিলে উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
তাঁদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগ জরুরি। তবে সংশোধনযোগ্য ত্রুটির ক্ষেত্রে আলোচনাভিত্তিক ব্যবস্থা নিলে নিরাপত্তার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকবে।
সরকারি সেবা সহজ করা ও যৌথ কমিটি গঠনের আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানান।
তাঁরা বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের নিয়মকানুন, ফি ও অনুমোদনের সময়সীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য না থাকায় উদ্যোক্তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ সমস্যা সমাধানে পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়তা ডেস্ক ও কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তাঁরা। নিয়মিত সভার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সমাধানের সময়সীমা ঠিক করার আহ্বান জানানো হয়।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, জামানতসংক্রান্ত শর্তে বাস্তবসম্মত সুবিধা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার দাবিও জানান ব্যবসায়ী নেতারা।
তাঁরা বলেন, বয়সের কারণে কোনো উদ্যোক্তা নির্দিষ্ট অর্থায়ন কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকলে তাঁর জন্য বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা উচিত। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি অর্থায়ন কর্মসূচির সুবিধা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানে স্থানীয়দের অংশগ্রহণের দাবি
কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানের অগ্রগতি সম্পর্কে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনগণকে স্পষ্ট তথ্য জানাতে হবে।
যানজট নিরসন, পর্যাপ্ত পার্কিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সৈকত ও জরুরি চিকিৎসাসেবাকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের সুফল শুধু বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা করপোরেট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ ও নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁরা দাবি করেন, গত দুই বছরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের উন্নয়নকাজ, সড়কের দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারেনি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাও পরিবর্তন হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের আট দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির পক্ষ থেকে আটটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
১. পর্যটন ব্যবসার লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সহায়তা ডেস্ক চালু করা।
২. উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা।
৩. ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্তোরাঁর মালিক-কর্মীদের নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৪. রেস্তোরাঁকর্মীদের নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
৫. প্রশাসন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যৌথ কমিটি গঠন করে সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।
৬. তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, জামানতসংক্রান্ত সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৭. কক্সবাজারের পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানের অগ্রগতি প্রকাশ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৮. পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর কর্মসংস্থান সুরক্ষায় সরকারি জরিপের মাধ্যমে তথ্যভান্ডার তৈরি এবং নতুন বিধিনিষেধ কার্যকরের আগে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, তাঁরা সংঘাত নয়, সমাধান চান। আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা, নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ এবং পর্যটকদের মানসম্মত সেবা দিতে তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, সহজ সরকারি সেবা, ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ এবং শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষায় সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সাদেক রুবেল, মাহমুদ শরীফ, আবুল মনজুর, খুরশেদ আলম জুয়েল, মোহাম্মদ আমির ও আবু তাহের।
তাঁরা মেরিন ড্রাইভকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসার বিদ্যমান সমস্যা সমাধান, উদ্যোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষায় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ফপি/মিব