যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে আরও শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার এবং হামলার পরিধি বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নতুন অস্ত্রের মজুত গড়ে তোলা হয়েছে এবং সম্ভাব্য সংঘাতে আগের চেয়ে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হবে।
তেহরানের এই বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা থেকে বিরত রাখার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা একাধিক প্রকাশ্য বক্তব্যে নতুন অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি বাড়তে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো, সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ডেটা সেন্টারের কথাও উঠে এসেছে।
গত সেপ্টেম্বরে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, নতুন করে হামলা হলে ইরানের প্রতিরক্ষা ও পাল্টা আক্রমণের কৌশলে বড় পরিবর্তন আসবে। নতুন অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অবাক হয়ে যাবে।’ তাঁর দাবি, ইরানের হাতে এমন কিছু লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেগুলোতে এখনো হামলা চালানো হয়নি। তবে এসব অস্ত্রের প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যুদ্ধের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা বললেও দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে হামলা শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেকেই আবারও বোমা হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের ৭০ বছর বয়সি এক বাসিন্দা জানান, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রেখেছেন, পানির মজুত করেছেন এবং জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রস্তুত রেখেছেন।
দুই সন্তানের এক মা বলেন, সন্তানদের প্রতিদিন স্কুলে পাঠানোর সময় তিনি উদ্বিগ্ন থাকেন। তাঁর আশঙ্কা, যেকোনো সময় আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
তেহরানের আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। কখন হামলা শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিরা নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্ত দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সিএনএন।
ইউরোপেও হামলার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা জিবিইউ-৪৩/বি, যা ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত, ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও রয়েছে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা শেখ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব সামরিক হুমকির উদ্দেশ্য ইরানের জনগণকে ভয় দেখানো। তিনি দাবি করেন, ইরানের জনগণ এসব চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
এদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন বিমানঘাঁটি এবং জার্মানির রামস্টাইন সামরিক ঘাঁটির মতো স্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফারজিন নাদিমির মতে, ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউরোপে হামলার সিদ্ধান্ত নিলে সেখানকার মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে সংঘাত অত্যন্ত গুরুতর পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত তেহরান এমন পদক্ষেপ নাও নিতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
নাদিমি আরও মনে করেন, ইরান ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ড্রোনের উন্নত বহর গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। এসব ড্রোনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান, গতিপথ পরিবর্তন এবং শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে চলার সক্ষমতা যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব উন্নত সক্ষমতা ইরান বাস্তবে অর্জন করেছে—এমন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ওয়ায়েজ সিএনএনকে বলেন, তেহরান বোঝাতে চাইছে, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে তার ভৌগোলিক পরিধি আরও বিস্তৃত হবে এবং পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যে পদক্ষেপগুলোকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে, ওয়াশিংটন সেগুলোকে উসকানি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এতে সংঘাত এড়ানোর পরিবর্তে যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরান পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে জ্বালানি স্থাপনা, বেসামরিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও রয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে। এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা ও সম্পদ লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানতে পারে তেহরান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ডেটা সেন্টার, এআই অবকাঠামো এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা যোগাযোগ কেবলও থাকতে পারে।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় তাঁদের প্রস্তুতি আগের তুলনায় বেশি।
দেশটির ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান আলি আল-নুয়াইমি বলেন, তাঁরা যুদ্ধ চান না। তবে দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
সব মিলিয়ে, ইরানের সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হামলার হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—কোনো পক্ষই নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সূত্র: সিএনএন
এফপি/মিব