ভারতের উত্তর কলকাতায় শনিবার (১৭ অক্টোবর) সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও বৃষ্টির জেরে হুড়োহুড়ি এবং পদপিষ্টের ঘটনায় ১৩ জন নারী ও একটি শিশুসহ অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ জন। আহতদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। খবর এনডিটিভি'র।
কলকাতা পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে গিরিশ পার্ক থানা এলাকার সারদা পার্ক (চোরবাগান) পুজো মণ্ডপের বাহির পথে প্রবল বৃষ্টির মাঝে অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপ তৈরি হয়। তাতেই এই বিশৃঙ্খলা ও পদপিষ্টের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উদ্ধারকাজে দ্রুত কন্ট্রোল রুম, দমকল বাহিনী, কলকাতা পুলিশ, ডিএমজি দল এবং একাধিক অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মণ্ডপটি দর্শনার্থীদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
লালবাজার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় আহত প্রায় ৩৫ জনকে দ্রুত উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (এমসিএইচ) পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া গুরুতর জখম কয়েকজনকে এসএসকেএম হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল অবিলম্বে হাসপাতালে ছুটে যান। তারা পুরো ঘটনার খোঁজখবর নেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পাশাপাশি, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ এক বার্তায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মণ্ডপের প্রবেশপথ ও বাহির পথ অত্যন্ত সংকুচিত থাকার কারণে এই বিপর্যয় ঘটে। বৃষ্টির মধ্যে একসঙ্গে বহু মানুষ বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করায় ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। অনেকেই পদপিষ্ট হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের সহায়তায় একটি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।
এবছর ৯১ বছরে পা দেওয়া উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পূজা মণ্ডপের প্রবেশপথ হিসেবে একটিমাত্র সরু গলি রয়েছে। এর মাত্র পাঁচ দিন আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই মণ্ডপটির উদ্বোধন করেছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, মণ্ডপের আশপাশের রাস্তায় দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানোর জন্য নামমাত্র কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী বা ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হয়েছিল। এছাড়া একটি গলি ভিআইপি-দের যাতায়াতের জন্য আলাদা করে সংরক্ষিত রাখায় সাধারণ মানুষের চলাচলে আরও বেশি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
সাধারণ দর্শনার্থীদের বেরোনোর বিকল্প পথটির রাস্তার প্রস্থ কোথাও ১০ ফুট আবার কোথাও ৩০ ফুটের মতো ছিল। সিঁড়ি পেরিয়ে যারা প্রস্থান গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন, অতিরিক্ত জ্যামের কারণে তারাও সহজে বাইরে বের হতে পারেননি।
এক দর্শনার্থীর অভিযোগ, 'পাশের পার্বতী ঘোষ লেন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং কোনো অ্যাম্বুল্যান্স ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এমনকি পুলিশও ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পরে স্থানীয় বাসিন্দারাই সাহসিকতার সঙ্গে ছুটে এসে ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা চালান।'
অন্য এক দর্শনার্থী জানান, মণ্ডপ প্রাঙ্গণে তার তিন বন্ধু ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে যান। তিনি তাদের তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন; পরবর্তীতে অন্য কয়েকজন এগিয়ে এসে তাঁদের টেনে বাইরে বের করেন।
এর আগে ২০১৫ সালে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গাপূজাতেও অতিরিক্ত ভিড়ের জেরে পদপিষ্টের মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেবার প্রায় ১১ জন আহত হওয়ার পর প্রশাসন বাধ্য হয়ে ওই পূজা মণ্ডপ বন্ধ করে দিয়েছিল।
এফপি/অ