কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের বেতাল গ্রামে সারা বছর অযত্নে-অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুরগাছের কদর বেড়েছে। শীত মৌসুমকে সামনে রেখে বাড়ির আনাচকানাচে অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুরগাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছিরা। গত কয়েক বছর ধরে গাছির অভাবে গ্রামের অনেক খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হতো না। ফলে এলাকায় দিন দিন খেজুরগাছ ও খেজুরের রসের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হালকা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌসুমি গাছিরা। পাশাপাশি রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তাঁরা। এ কারণে সারা বছর অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুরগাছের কদর বেড়েছে। এলাকার আনাচকানাচে বেড়ে ওঠা এসব গাছ এখন স্থানীয়দের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। খেজুরের রস সংগ্রহ করতে বাইরে থেকেও গাছিরা এসেছেন গ্রামে।
মৌসুমি গাছি হাসান মিয়া দৈনিক যায়যায়দিনকে বলেন, ‘এ গ্রামে আমরা প্রথমবারের মতো রস সংগ্রহ করতে এসেছি। বর্তমানে রসের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় বিক্রিও কম হচ্ছে। দীর্ঘদিন অযত্নে-অবহেলায় পড়ে থাকা খেজুরগাছগুলো চুক্তিভিত্তিক নেওয়ায় উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছেন। গাছের মালিক চুক্তি অনুযায়ী টাকা পাচ্ছেন, আর আমরা রস বিক্রি করে আয় করছি। রস নিজেরাও খাই, আবার বিক্রিও করি। প্রতি লিটার খেজুরের রস ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি করছি।
আরেকজন গাছি জানান, প্রতিটি খেজুরগাছের রস সংগ্রহের স্থান পরিষ্কার -পরিচ্ছন্ন করে গাছে নল লাগানো হয়েছে। বিকেলে গাছের ডালপালা ছাঁটাই করে গাছিরা মাটির হাঁড়ি বেঁধে দেন। রাতের বেলায় হাঁড়িতে বাদুড়ের বসা ঠেকাতে নেট ব্যবহার করা হচ্ছে। সকালে সংগৃহীত কাঁচা রস বাজারে বিক্রি করা হয়। আবার অনেকে কাঁচা রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করেন।
ওই গাছি জানান, গ্রামের প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি গাছ থেকে প্রতিদিন সকালে ২৫ থেকে ৩০ লিটার রস সংগ্রহ করা হয়। গ্রামের মানুষের চাহিদা মেটানোর পর অবশিষ্ট রস বাজারে পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়।
কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা গ্রামের আব্দুল হক (৮০) বলেন, ‘একসময় গ্রামের মেঠোপথের পাশে, বাড়ির আঙিনায় ও জমির আইলে সারি সারি খেজুরগাছ চোখে পড়ত। কিন্তু কালের বিবর্তনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় আগের মতো আর সারি সারি খেজুরগাছ দেখা যায় না। কোথাও কোথাও খেজুরগাছ চোখে পড়লেও সেগুলোর তেমন কদর নেই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নতুন করে খেজুরগাছ রোপণে মানুষের আগ্রহের অভাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই গাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। খেজুরগাছ রোপণে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো হলে এ গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কটিয়াদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘খেজুরগাছ এমন একটি গাছ, যার জন্য বাড়তি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি গাছিদের সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের বাড়ির আশপাশে, জমির আইলে, পুকুরপাড়ে এবং সড়কের ধারে খেজুরগাছ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
এফপি/মিব