Dhaka, Friday | 28 August 2026
         
English Edition
   
Epaper | Friday | 28 August 2026 | English
শিরোনাম:

বর্ষা ফুরোলেই তৃষ্ণার দিন: কয়রায় মিঠা পানির সংকট

প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম  (ভিজিটর : ৯)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

চারদিকে পানি। সামনে নদী, পেছনে খাল। চারপাশে অসংখ্য চিংড়িঘের। বর্ষা এলে বৃষ্টির পানিতে ভরে যায় গ্রামের পুকুরগুলো। অথচ সেই পানির মধ্যেই নিরাপদ এক গ্লাস খাবার পানির জন্য মানুষের কষ্টের শেষ নেই।

কয়রার অনেক গ্রামের মানুষের কাছে সুপেয় পানি যেন প্রতিদিনের এক অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে নারীদের দিনের একটি বড় সময় চলে যায় পানি সংগ্রহ করতে। ভোরে ঘুম থেকে উঠে সংসারের কাজ শুরুর আগেই কাঁখে কলসি কিংবা হাতে জার নিয়ে বের হতে হয়। কাছের কোনো উৎসে পানি না মিললে হাঁটতে হয় এক-দুই কিলোমিটার, কোনো কোনো এলাকায় তারও বেশি।

কয়রা সদর উপজেলার গোবরা গ্রামের নার্গিস সুলতানার অভিজ্ঞতাও একই। তাঁর কথায়, বর্ষার সময়টা কিছুটা স্বস্তির। বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়, পুকুরেও পানি থাকে। কিন্তু বর্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর থেকেই আবার শুরু হয় পানির জন্য ছুটে চলা।

কয়রার উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়েছে পানির উৎসেও। অনেক জায়গায় অগভীর নলকূপের পানি পানযোগ্য নয়। কোথাও আবার গভীর নলকূপেও মিঠা পানি পাওয়া যায় না। ফলে মানুষকে পুকুর, বৃষ্টির পানি এবং হাতে গোনা কয়েকটি মিঠা পানির উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় কয়রার পানীয় পানির ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ উৎসে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ পানির উৎসগুলোর অর্ধেকেরও বেশি লবণাক্ততার সমস্যায় রয়েছে।

এক কলসি পানির জন্য দীর্ঘ পথ

মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা সদর, বাগালী ও উত্তর বেদকাশীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মিঠা পানির সংকট নতুন নয়। কোনো কোনো গ্রামে একটি মাত্র নলকূপে মিঠা পানি পাওয়া যায়। তখন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষও সেই নলকূপের দিকে ছুটে আসেন। ফলে পানি নিতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কখনো এক কলসি পানি পেতে অনেকটা সময় কেটে যায়।

গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কয়রার কিছু এলাকার নারীদের দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূর থেকেও পানি সংগ্রহ করতে হয়। এতে শুধু সময়ই যায় না, শারীরিক পরিশ্রমও করতে হয়। পরিবারের পুরুষেরা কাজে বাইরে থাকায় পানি সংগ্রহের এই দায়িত্ব অনেকটা নারীদের ওপরই পড়ে।

বৃষ্টির পানি বর্ষাকালে বড় ভরসা হলেও সমস্যা হয় শুষ্ক মৌসুমে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় এবং অনেক বাড়িতে প্রয়োজনীয় ধারণক্ষমতার ট্যাংক না থাকায় সারা বছর বৃষ্টির পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ কয়রার সমস্যা শুধু পানির উৎসের নয়। বৃষ্টির সময় পাওয়া পানি কীভাবে কয়েক মাস নিরাপদে সংরক্ষণ করা যাবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

লবণাক্ত পানিতে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা

উপকূলীয় এলাকায় পানির লবণাক্ততা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা হচ্ছে। এসব গবেষণায় পানীয় জলের লবণাক্ততা ও অতিরিক্ত সোডিয়ামের সঙ্গে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের পানীয় জলের সোডিয়াম মাত্রা ও রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারী নারীদের ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি ছিল।

এর আগের গবেষণাগুলোতেও উপকূলীয় বাংলাদেশের পানির লবণাক্ততা ও উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করলে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে—এমন তথ্যও গবেষণায় এসেছে।

তবে কয়রার মানুষের ক্ষেত্রে পানির লবণাক্ততার সঙ্গে নির্দিষ্ট রোগের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিতভাবে জানতে নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যতথ্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জরিপ প্রয়োজন।

বৃষ্টিই যখন সবচেয়ে বড় ভরসা

কয়রার অনেক পরিবারের কাছে বৃষ্টির পানি শুধু পানি নয়, কয়েক মাসের সঞ্চয়।

বাড়ির টিনের চাল থেকে পাইপের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ট্যাংকে ধরে রাখা হয়। সেই পানি দিয়ে রান্না, পান করাসহ নানা প্রয়োজন মেটানো হয়। কিন্তু ছোট ট্যাংকে কয়েক মাসের বেশি পানি ধরে রাখা কঠিন। বর্ষা শেষ হলে ট্যাংকের পানি দ্রুত কমতে থাকে।

পানি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায়ও বলা হয়েছে, বড় ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কয়রার মানুষের পানির সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে ট্যাংকের খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখার সক্ষমতা—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।

পুকুর আছে, কিন্তু সব পুকুরের পানি নিরাপদ নয়

কয়রায় পুকুরের পানিও মানুষের অন্যতম ভরসা। কোথাও পুকুরের পানি ফিল্টার করে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু সব পুকুরের পানি সারা বছর নিরাপদ থাকে না।

লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়া, দূষণ এবং নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে অনেক পুকুরের পানির মান নষ্ট হয়। কোথাও পুকুর স্যান্ড ফিল্টার বা পিএসএফ স্থাপন করা হলেও পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—একটি প্রকল্প করে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ?

পানি সরবরাহের ব্যবস্থা তৈরি করার পর সেটি কে দেখভাল করবে, নষ্ট হলে কে মেরামত করবে, সেই খরচ কোথা থেকে আসবে—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে অনেক ভালো উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত কাজে আসে না।

সরকারি উদ্যোগ আছে, তবু সংকট কাটছে না

সুপেয় পানির সংকট কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক বিতরণ, পুকুর খনন ও সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লবণাক্ততার কারণে কয়রার অনেক এলাকায় গভীর নলকূপও কার্যকর নয়। তাই ভূ-উপরিস্থ পানি ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে কয়রার বাস্তবতা আরও কঠিন। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা লবণাক্ত পানির প্রবেশে একটি মিঠা পানির উৎস নষ্ট হতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই একটি ট্যাংক দেওয়া বা একটি পুকুর খনন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে—এমনটা ভাবার সুযোগ নেই।

প্রকল্প আছে, কিন্তু প্রকল্পের পর কী?

কয়রার পানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। কোথাও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ট্যাংক, কোথাও কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, আবার কোথাও পিএসএফ স্থাপন করা হয়েছে। পানি ব্যবস্থাপনা কমিটিও গঠন করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।

এনজিও ফোরামের ২০২৪-২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় খুলনা ও সাতক্ষীরায় জলবায়ুজনিত লবণাক্ততা মোকাবিলায় শত শত কমিউনিটি রেইনওয়াটার হারভেস্টিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী-নেতৃত্বাধীন পানি ব্যবহারকারী দলও গড়ে তোলা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে অনেক নারীকে পানি সংগ্রহে আগের তুলনায় কম সময় ও শ্রম দিতে হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় প্রকল্প শেষ হওয়ার পরের সময়টা নিয়ে।

কয়রা উপজেলা সদরের মদিনাবাদ ও দেয়াড়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এনজিওর সহায়তায় তৈরি কয়েকটি পানি সরবরাহ প্রকল্প এখন আর আগের মতো সচল নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প চালুর সময় যে নজরদারি থাকে, পরে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে তেমন গুরুত্ব থাকে না। ফলে ভালো উদ্যোগও একসময় অচল হয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন। শুরুতেই যদি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব, অর্থের উৎস এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা যায়, তাহলে প্রকল্পগুলো অনেক বেশি কার্যকর রাখা সম্ভব।

সমাধান কোথায়?

কয়রার পানির সংকট কোনো একটি প্রযুক্তি দিয়ে রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। দরকার দীর্ঘমেয়াদি ও এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা।

প্রথমে জানতে হবে—কোন এলাকায় পানিতে কতটা লবণাক্ততা, কোথায় সারা বছর মিঠা পানি পাওয়া যায়, কোন পুকুর ব্যবহারযোগ্য এবং কোথায় ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির সম্ভাবনা রয়েছে। এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে ইউনিয়নভিত্তিক পানির মানচিত্র তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রতিটি গ্রামে বড় ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু ট্যাংক বসালেই হবে না; বর্ষার পানি যেন শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত নিরাপদে রাখা যায়, সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।

যেসব পুকুরে মিঠা পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব, সেগুলোকে কমিউনিটি নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। পিএসএফ স্থাপনের পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার, মেরামত ও পানির মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। আর পানি সংগ্রহের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যেহেতু নারীদের ওপর, তাই পানি ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, এনজিও এবং স্থানীয় মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ কয়রার পানির সংকট শুধু একটি পানি সরবরাহের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, জনস্বাস্থ্য, নারীর শ্রম এবং মানুষের মৌলিক মর্যাদার প্রশ্ন।

কয়রার মানুষ চারদিকে পানি দেখেও যদি এক কলসি মিঠা পানির জন্য কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটেন, তাহলে সেই সংকটের গভীরতা বুঝতে আর কোনো পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না।

সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উপকূলের আরও ভেতরে ঢুকবে কি না, তা হয়তো পুরোপুরি আমাদের হাতে নেই। কিন্তু মানুষের ঘরে নিরাপদ পানির কল পৌঁছে দেওয়া, পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা এবং সেই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের হাতেই।

কয়রার নারীদের হাতে প্রতিদিন কলসি তুলে দেওয়ার বদলে তাদের বাড়ির কাছেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে মানবিক শুরু।

এফপি/অ
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝