উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে নীলফামারীর ডিমলায় দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ওঠানামা করছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেল ৩টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ০ মিটার, যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচে।
একই দিন সকাল ৯টায় এই পয়েন্টে পানি ছিল বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার নিচে (৫১ দশমিক ৯৪ মিটার)। এর আগে বুধবার (২২ জুলাই) ভোর ৬টায় পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচে (৫২ দশমিক ১৪ মিটার) প্রবাহিত হয় এবং সকাল ৯টা পর্যন্ত তা অপরিবর্তিত ছিল। পরে দুপুর ১২টায় পানি কমে ৭ সেন্টিমিটার নিচে, সন্ধ্যা ৬টায় ১৭ সেন্টিমিটার নিচে এবং রাত ৯টায় ২১ সেন্টিমিটার নিচে নেমে আসে।
পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
এদিকে, উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা (কেল্লাপাড়া) ও ভেন্ডাবাড়ী এলাকায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দাবি করেছেন, তার ইউনিয়নে কোনো পরিবার পানিবন্দী নয়।
অন্যদিকে, পানিবন্দী মানুষেরা জানিয়েছেন, নদীর পানি ঘরের মেঝে পর্যন্ত উঠে গেছে। অনেকেই বাড়িঘর ভেঙে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ আরও দুই শতাধিক পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, ফসলি জমি এবং অর্ধশতাধিক পরিবারের বসতভিটা নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী।
পানিবন্দী মানুষেরা জানান, খাবার, গবাদিপশুর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
ছাতুনামা (কেল্লাপাড়া) এলাকার বাসিন্দা হবিবর রহমান বলেন,
“এই এলাকার পাঁচ থেকে সাত শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছি। ইউপি চেয়ারম্যান একবারও আমাদের খোঁজ নিতে আসেননি। ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি উঠেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ আরও দুই শতাধিক পরিবার এখনো ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিটি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা শুকুর আলী বলেন,
“আমাদের পাঁচ থেকে সাত শতাধিক পরিবার পানিবন্দী। আমার ঘর থেকে পানি নেমে গেলেও উঠানে এখনো পানি রয়েছে। রাস্তা তলিয়ে গেছে। একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা ভেঙে গেছে। চেয়ারম্যান একবারও খোঁজ নেননি। তবে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সাত্তার ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।”
৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লাভলু ইসলাম বলেন,
“প্রায় সাত শতাধিক পরিবার পানিবন্দী। অর্ধশতাধিক পরিবার বাড়িঘর ভেঙে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার পানিতে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা এবং শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাবার, গবাদিপশুর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। এমপি ছাড়া কেউ খোঁজ নেননি। এমনকি ইউপি চেয়ারম্যানও একবারের জন্য আসেননি। পানি উন্নয়ন বোর্ড তিন শতাধিক জিও ব্যাগ ফেলার কথা বললেও এখনো সেই কাজ শুরু হয়নি।”
অভিযোগের বিষয়ে ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক বলেন,
“আমার এলাকায় কোনো পরিবার পানিবন্দী নেই।”
পরে তাকে ছবি ও ভিডিও থাকার বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন,
“আমি সকালে বন্যার ত্রাণের চাল আনতে ডিমলায় গিয়েছিলাম। এ পর্যন্ত ১৩ মেট্রিক টন চাল ও ২০টি শুকনো খাবারের প্যাকেজ পেয়েছি। সেগুলো ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।”
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন,
“আগাম পানি বাড়ার তথ্য জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও নদীবেষ্টিত এলাকার বাসিন্দাদের জানানো হয়েছিল। বুধবার ভোরে পানি বাড়লেও পরে ধীরে ধীরে কমে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।”
এফপি/র