টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, পটিয়া, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ১৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর পাশাপাশি কৃষি, বসতঘর ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি মিলিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বাঁশখালীর কাথরিয়া ইউনিয়নের খামারি আশেকের মতো হাজারো মানুষের জীবিকা মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে। বন্যার পানিতে তার খামার তলিয়ে গিয়ে এক হাজারের বেশি মুরগি মারা গেছে। কয়েকদিন আগেও স্বাবলম্বী এই খামারি আজ নিঃস্ব। এমন অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন ভেসে গেছে বানের পানিতে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখনো পানিতে নিমজ্জিত। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেক এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। বহু কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে এবং অসংখ্য পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র অথবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর-দিঘি এবং ৩২০টি মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী, যেখানে প্রায় ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার মাছের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, বন্যায় ৩১টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া, ৮৭ হাজার ৩৯৫টি মুরগি এবং এক হাজার হাঁস মারা গেছে। এ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ ধান, ১ হাজার ৮১২ দশমিক ১৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২ হাজার ৫৯৪ দশমিক ১৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে খাদ্য উৎপাদনেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, বন্যার পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও বড় হতে পারে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের বন্যায় কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই শুধু ত্রাণ নয়, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি ও মৎস্য খাতে প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনার কার্যকর পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাজারো পরিবার আজ শুধু ঘরবাড়ি নয়, তাদের জীবিকা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নও হারিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরকারি সহায়তা ও সমন্বিত পুনর্বাসন কার্যক্রম গ্রহণই হতে পারে তাদের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র ভরসা।
এফপি/অ