দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য, বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্যভান্ডার সুন্দরবনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা যেন বারবারই উপেক্ষিত হচ্ছে। মাছ ও কাঁকড়ার নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে চলমান তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলেও একের পর এক জেলে ও শিকারচক্রের সদস্যরা অবৈধভাবে বনাঞ্চলে প্রবেশ করছে। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় প্রতিদিনই ধরা পড়ছে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের ঘটনা। এতে প্রশ্ন উঠেছে—কঠোর নিষেধাজ্ঞার পরও কীভাবে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো বারবার সুন্দরবনের অভয়াশ্রমে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে?
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পূর্ব সুন্দরবনের তিনটি পৃথক এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ জন জেলেকে আটক করেছে বন বিভাগ। জব্দ করা হয়েছে তিনটি মাছ ধরার নৌকা, মাছ ধরার জাল এবং ১০টি ক্যারেটে ভর্তি প্রায় ২০০ কেজিরও বেশি জীবন্ত কাঁকড়া।
শুক্রবার দুপুরে বন আইনে মামলা দায়ের করে আটক ব্যক্তিদের খুলনার দাকোপ আদালতে পাঠানো হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাস জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বনরক্ষীরা জোংড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুটি নৌকাসহ চারজন, করমজল এলাকায় একটি নৌকাসহ তিনজন এবং ধানসাগর এলাকায় আরও তিনজন জেলেকে আটক করেন।
আটক ব্যক্তিরা হলেন—বকুল মল্লিক (৩০), জয়নাল শেখ (২৯), সেলিম মল্লিক (২২), সালাম মল্লিক, এনামুল কবির (৪৩), আবু আনছার শেখ (৩২), জাকারিয়া মল্লিক (৪৮), ইয়াসিন (৪২), কিবরিয়া (৫৫) ও আনোয়ার গাজী (৭০)। তাদের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল ও মোংলা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে বর্তমানে তিন মাসের জন্য বনাঞ্চলে সব ধরনের মাছ ও কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা বনাঞ্চলে প্রবেশ করে অবৈধভাবে কাঁকড়া শিকার করছিল। তাদের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা করা হয়েছে এবং আদালতে পাঠানো হয়েছে। জব্দ করা জীবন্ত কাঁকড়াগুলো খুলনা ফরেস্ট ঘাটসংলগ্ন রূপসা নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে।”
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বনাঞ্চলে প্রবেশ, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু উচ্চমূল্যের কাঁকড়া ও মাছের লোভে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনাঞ্চলে প্রবেশ করছে। অভিযানে নিয়মিত জেলে আটক হলেও অবৈধ অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় আরও কঠোর নজরদারি, জলপথে টহল বৃদ্ধি এবং অবৈধ শিকারচক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবনের মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননকাল সুরক্ষিত না হলে শুধু বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য নয়, উপকূলীয় অর্থনীতি ও দেশের সামুদ্রিক সম্পদও দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে। তাই নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পাশাপাশি অবৈধ শিকারে অর্থ জোগানদাতা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযানই হতে পারে টেকসই সমাধান।
এফপি/অ