গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উপজেলার ২৫টি ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার সাত শত ৫০থেকে দুই হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন। তবে জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের সীমিত সরবরাহ এবং কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে কাঙ্ক্ষিত সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। এসব ক্লিনিকে সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মাতৃ ও শিশুসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি পরামর্শ, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা এবং বিনামূল্যে প্রাথমিক ওষুধ বিতরণ করা হয়। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এসব ক্লিনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল।
বর্তমানে ২৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে তিনজন করে মোট ৭৫ জন কর্মরত রয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য পরিদর্শকের অনুমোদিত তিনটি পদের একটিও পূরণ হয়নি। সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের সাতটি পদও শূন্য। এছাড়া স্বাস্থ্য সহকারীর ৩৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ জন। ফলে রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান কার্যক্রম এবং নিয়মিত তদারকিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
সরেজমিনে কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই রোগীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। নারী, শিশু, প্রবীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষই এসব ক্লিনিকের প্রধান সেবাগ্রহীতা। অনেকেই জানান, গ্রামের কাছেই চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় সময় ও যাতায়াত ব্যয় দুটিই কমেছে। তবে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ সবসময় পাওয়া না যাওয়ায় অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়।
এদিকে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, কোনো কোনো কমিউনিটি ক্লিনিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হন না। কোথাও কোথাও ক্লিনিকের পরিচ্ছন্নতা সন্তোষজনক নয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কিছু সেবাগ্রহীতা স্বাস্থ্যকর্মীদের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগ সব কমিউনিটি ক্লিনিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, "কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সীমিত জনবল নিয়েও আমরা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। শূন্য পদগুলো পূরণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কোথাও অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার সাইফুল আলম বলেন, "প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগীকে সেবা দিই। অনেক সময় রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হয়। আমরা সাধারণ চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর টিকাদান ও স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে থাকি। জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আরও বাড়ানো হলে সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে।"
সেবাগ্রহীতা সেলিনা আক্তার (৩৫) বলেন, "আগে সামান্য চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হতো। এখন গ্রামের কাছেই চিকিৎসা পাই। এতে সময় ও যাতায়াত খরচ কমেছে।"
আরেক সেবাগ্রহীতা আবুল কাশেম (৭২) বলেন, "স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকভাবে সেবা দেন। তবে সব ধরনের ওষুধ সবসময় পাওয়া যায় না। প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষ আরও উপকৃত হবে।"
২ নম্বর বিনোদনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ফতেহ বলেন, "কমিউনিটি ক্লিনিক গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ, নিয়মিত তদারকি এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।"
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে আরও কার্যকর করতে শূন্য পদে দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, নিয়মিত মনিটরিং এবং সেবাগ্রহীতাদের প্রতি পেশাদার ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নবাবগঞ্জের গ্রামীণ জনগণ আরও উন্নত, সহজলভ্য ও মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।
এফপি/সা