চট্টগ্রাম বন্দরকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। সেই বন্দরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১১ সংসদীয় আসন বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দেশের আমদানি-রফতানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশ এই এলাকা ঘিরে পরিচালিত হয়। বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মিলনমোহনায় অবস্থিত হওয়ায় ভৌগোলিক দিক থেকেও এই আসনের গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে এটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মর্যাদাপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত।
চট্টগ্রাম-১১ আসনটি বহু বছর ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। এক সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী টানা একাধিকবার এখান থেকে জয়ী হয়ে আসনটিকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত করেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তার কারণে স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি একজন শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত নেতা হিসেবেই পরিচিত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী করেছে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে খসরুকে প্রার্থী করায় বিএনপি এখানে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে চাচ্ছে। চারবারের সংসদ সদস্য হওয়া এবং সাবেক মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা তাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে।
অন্যদিকে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ শফিউল আলমকে। যদিও তিনি স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সিলর ছিলেন, তবে জাতীয় সংসদের নির্বাচনী মাঠে এটি তার প্রথম অংশগ্রহণ। ফলে আমীর খসরুর মতো অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় নেতার বিপক্ষে তার লড়াইকে কঠিন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিচিতির কারণে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছেন বলে স্থানীয় আলোচনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম-১১ আসনে ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি। এখানে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ইপিজেড ও কর্ণফুলী ইপিজেড থাকায় বিভিন্ন জেলার বিপুল শ্রমজীবী মানুষের বসবাস রয়েছে। এই আসনের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, ইস্টার্ন রিফাইনারি, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, নৌ ও বিমানঘাঁটিসহ বহু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব বড় স্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ভোটারদের প্রত্যাশাও এখানে অনেক বেশি, আর তারা অভিজ্ঞ নেতৃত্বের দিকে বেশি ঝুঁকছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বনেদি পরিবারের সন্তান। তার বাবা মাহমুদুন্নবী চৌধুরীও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তান আমলে আইন পরিষদের সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। আমীর খসরু দেশে পড়াশোনা শেষ করে লন্ডন থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসেন। এরপর ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং চারদলীয় জোট সরকারের সময় বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এবারের নির্বাচনে প্রচারেও তাকে অত্যন্ত সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। শুধু সভা-সমাবেশ নয়, তিনি অলিগলি, কলোনি, বস্তি ও বাজারে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করছেন। তার প্রচারে জনসমাগম বাড়ছে এবং দলীয় নেতাকর্মীরাও উজ্জীবিত। বিএনপির দাবি, ধানের শীষের পক্ষে জনসমর্থনের জোয়ার তৈরি হয়েছে এবং মানুষ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছে।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী শফিউল আলম প্রতিদিন মিছিল ও গণসংযোগ করলেও অভিজ্ঞতার জায়গায় তিনি পিছিয়ে রয়েছেন। কাউন্সিলর পর্যায়ের রাজনীতি থেকে জাতীয় সংসদের বড় নির্বাচনী মাঠে আসা যে কঠিন চ্যালেঞ্জ, সেটাই তার প্রচারে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন অনেকেই। ফলে এই আসনে জামায়াতের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম-১১ আসনে এবারের নির্বাচন ঘিরে আলোচনা থাকলেও বাস্তবতা হলো, অভিজ্ঞ সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের কারণে শক্ত অবস্থানেই রয়েছেন। তার বিপরীতে জামায়াত প্রার্থীর জন্য এই নির্বাচনী লড়াই সহজ নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল কী হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এফপি/এমআই