বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়ি। দুর্গম জনপদে বসবাসকারী লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ বাস্তবে এই হাসপাতাল এখন আর চিকিৎসার আশ্রয়স্থল নয়—বরং রোগী ও চিকিৎসক সবার জন্যই এক ভয়ংকর মৃত্যুঝুঁকির ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়—চিকিৎসা অবকাঠামো, জনবল ও নিরাপত্তা—সবকিছুর ভয়াবহ সংকট। যেখানে সরকারি বিধি অনুযায়ী এই হাসপাতালে কমপক্ষে ১৭ জনের বেশি চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৩ জন ডাক্তার। অথচ প্রতিদিন বহির্বিভাগে রোগীর চাপ ৩০০ থেকে ৪০০ জন।
হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন ও বহির্বিভাগের অবস্থা বর্ণনাতীত। ভাঙাচোরা কক্ষ, নোংরা পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অসুস্থ মানুষ—সব মিলিয়ে যেন চিকিৎসা নয়, এক নিষ্ঠুর অপেক্ষার নামই এখানে স্বাস্থ্যসেবা।
২৪ ঘণ্টা খোলা থাকার কথা থাকলেও জরুরি বিভাগ কার্যত অচল। এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও আধুনিক রোগ নির্ণয় যন্ত্র থাকলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। ছোট ও মাঝারি ধরনের অস্ত্রোপচারও করা যাচ্ছে না। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরে ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিকে ছুটতে হচ্ছে।
১৯৮৭ সালে নির্মিত হাসপাতাল ভবনটি যেন আজ নিজেই এক মুমূর্ষ রোগী। দীর্ঘ ৩৯ বছরেও কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। ভবনের দেয়াল ও ছাদজুড়ে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা। বৃষ্টি হলেই দেয়াল বেয়ে পানি ঝরে পড়ে। সম্প্রতি হাসপাতালের রান্নাঘরের ছাদ ধসে পড়লে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান এক নারী কর্মচারী।
বাথরুমের পাইপ ফেটে নোংরা পানি আর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে ওয়ার্ডে ও করিডোরে। নোংরা টয়লেট, আবর্জনায় ভরা ওয়ার্ডে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি। চিকিৎসক থেকে শুরু করে রোগী—সবার চোখেমুখে এখন একটাই আতঙ্ক, “কবে কোথায় দুর্ঘটনা ঘটে।”
৫০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে পুরুষ, মহিলা, শিশু ও গাইনি ওয়ার্ড থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে মাত্র ৩১টি বেডে কোনো রকমে চিকিৎসা চলছে। নেই সার্বক্ষণিক জরুরি প্রসূতি সেবা (ইএমওসি)। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগের বহিঃবিভাগীয় ক্লিনিকও কার্যত বন্ধ।
তবে শিশুদের টিকাদান কেন্দ্র ও যক্ষা পরীক্ষা ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা অভিযোগ করে জানান, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে কিনতে হয়। এক রোগী বলেন, “এখানে ডাক্তার দেখাতে এসে মনে হয় আমরাই ডাক্তারকে কষ্ট দিচ্ছি। এত রোগীর ভিড়ে তিনজন ডাক্তার কীভাবে সামলাবে?”
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবুল মনজুর বলেন, “জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতাল ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা অবিলম্বে—চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার মা ও নবজাতকের জরুরি সেবা চালু এই চার দাবিতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চান।
পাহাড়ি জনপদের লক্ষাধিক মানুষের জীবন যেখানে নির্ভর করছে এই একটি হাসপাতালের ওপর, সেখানে অবহেলা মানে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে নিষ্ঠুর তামাশা।
নাইক্ষ্যংছড়ির ৫০ শয্যার হাসপাতাল আজ চিকিৎসার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক করুণ দলিল।
এফপি/জেএস