বাংলাদেশের নব্বই দশকের নিভৃতচারী কবি ও সাংবাদিক মৃধা আলাউদ্দিন। রোমান্টিকতার কবি হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেবল কাব্যিক অনুষঙ্গ নয়, তা তাঁর জীবনযাপনেরই অংশ। এই সম্পর্কের প্রমাণ মেলে তাঁর ঘরের ভেতরেই। কবুতর, মোরগ-মুরগি, পশুপাখি আর গ্রামীণ পরিবেশের মধ্যেই তিনি স্বস্তি খুঁজে পান। সেখান থেকেই বারবার ফিরে আসেন নিজের কবিত্বের কাছে। এই সংযোগই তাঁকে মনে করিয়ে দেয় তিনি কেন লেখেন, কোন মাটি থেকে তাঁর শব্দেরা জন্ম নেয়।
এই কবির জন্মদিন ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ। যদিও দিনটি পড়েছে সোমবারে, তবু জন্মদিন উদযাপন হবে সম্ভবত শুক্রবারে, কারণ সোমবারে সবাই থাকেন কাজে ব্যস্ত। সেই উপলক্ষে কেরানীগঞ্জ সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কবিতা পাঠ ও আলোচনা সভা। একজন নিভৃতচারী কবির জন্য এ যেন নীরব ভালোবাসার প্রকাশ।
জন্মদিন উপলক্ষে আমাকেও তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সাত সাগর তেরো নদীর ওপারে আমার বসবাস। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও উপস্থিত থাকা হলো না। তাই দূর থেকেই তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। একটি মজার ও অর্থবহ মিল আছে। ঠিক এই একই দিনে আমারও জন্মদিন। দুই ভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে একই দিনের আলোয় আমরা দুজনই স্মরণ করি শব্দ, স্মৃতি আর পথচলার কারণ।
কবির জন্মদিনে, কবিকে স্মরণ করে তার নিজস্ব লেখা একগুচ্ছ কবিতা এই লিখাটিতে সংযুক্ত করেছি। কারণ তার অসাধারণ প্রতিভাকে তুলে না ধরলে, কবির জন্মদিনের শুভেচ্ছা পূর্ণভাবে পৌঁছাবে না।
তুমি নদী হয়ে গ্যাছো
নদী ধুয়ে দ্যায় সবাইকে
নিয়ে যায় হিমাচল, নীলিগিরি
নায়েগ্রা, নীলাচল
অচেনা-অজানা দারুণ দিগন্তে
নদী মৃতকে দ্যায় জীবন
মূককে দ্যায় প্রাণোচ্ছ্বল
নির্ঝঞ্ঝাট, সন্ধ্যার ষড়ৈশ্বর্যে
সাবলীল-সুন্দর ভাষা
আমাকে বারবার কাঁদিয়েছে নদী
বঞ্চিত করেছে তাবৎ ঐশ্বর্য
ভালোবাসা ও নুনের হাটবাজার থেকে;
বিমূর্ত রসায়নে ফেটে যায় এই দেহ
আমি কেঁদে কেঁদে রাত্রিরে বর্ষার
পিরামিড অথবা তাজমহল হয়ে যাই,
যেনো কষ্টের পাহাড় গলে ঝলসে ওঠে আগুন
নদী দেখলেই তোমাকে মনে পড়ে
উজানের আছাড়িপিছাড়ি তমস্যায়
তুমি নদী হয়ে গ্যাছো…
দ্য লাস্ট কিস
এসো আমরা চলে যাই
জনান্তিকে, রাস্তায়
টর্নেডো, টাইফুন ছেড়ে
জৌলুসপূর্ণ রৌদ্দুরে
এসো আমরা বিশ্রাম করি
নৈশ নীড় ও বালাখানায়
বালিয়াড়ি পাড়ে
ঘুমিয়ে শুনি পড়শির পদাবলি
অথবা চলো আমরা চলে যাই
বৈষ্ণবদের কাম-কলা পদাবলি ছেড়ে
রাস্তায়
রৌদ্দুরে
এসো আমরা চুম্বন করি
হাতে, গালে,
নাভি-নিতম্বে, নিম্ননাভিমূলে
চুম্বনের এই প্রেম অথবা মহাযুদ্ধ
মিলনের চেয়ে বলো, পৃথিবীতে দামি আর কি হতে পারে
এসো আমরা চলে যাই
বৈষ্ণবদের কাম-কলা, পড়শির পদাবলি ছেড়ে
রাস্তায়
রৌদ্দুরে...
সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে
মানুষ আর মানুষ থাকবে না
সামনের শীতে সে রৌদ্র হবে
ঝরনা হবে পৃথিবীর অর্ধেক
একদিন খাটাসও খর্ব হবে
থাকবে না খোয়া ওঠা খাল,
সরে যাবে ঘিচিমিছি, ঘিঞ্জি প্রতারক ঘাস
কাক, কাকের কর্কশ আওয়াজ
পুড়ে যাবে বেহায়া বাতাস, জবড়জং জীবাশ্ম
নষ্ট হওয়া নারী, ছেঁড়া নাও
নৌফেল
নায়েগ্রার উত্তাল জলরাশি থেকে উঠে আসবে
আমাদের বারান্দায় রোদ…
সুউচ্চ মিনার থেকে আমরা শুনব আজান
এবং আলো আসবে আমাদের জরাজীর্ণ প্রাসাদে
যেনো পুড়ে যায় বেহায়া বাতাস
জবড়জং জড়ি ও জীবাশ্ম
হে নদী! অশ্বারোহী আপেল,
গাছের রৌদ্র ছেড়ে দেবো
এবং অভিন্ন ভ্রণ, খুলে যাবে খাল
খালের খোল, খৈয়াম
যেনো সামনের শীতে, শীত মানুষ রৌদ্র হয়
ঝরনা হয় পৃথিবীর অর্ধেক
নায়েগ্রার উত্তাল জলরাশি থেকে উঠে আসবে
আমাদের বারান্দায় রোদ,
আমরা শুনব সুউচ্চ মিনার থেকে আলোর আজান…
খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগ্ণ রোড
খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগ্ণ রোড
দুপাশে পুষ্টিহীন গাছ, ডাঙ্গা
কালিক মেশানো ন্যায্যমূল্যের বাতাস;
ছিন্ন বিদ্যুৎ
এবং এখানে আমি একা হেঁটে যাই অন্ধ চোখে
যাই কুয়াশার তাঁতে বোনা বিচ্ছেদের ভীষণ শরীরে
ছেঁড়া কার্পেট
খরস্রোতা যৌবনে
প্রতিদিন ভুলে থাকি মর্ত্যরে মানুষ আম-আপেল
জবড়জং এই জীবাশ্ম, জন্ম-জন্মের অলৌকিক আয়োজন
রুটি, ভাত-কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল; নাস্তার টেবিলে কিছুই পাই না
ভরা ফার্মেসির জানালায় ওঠে নষ্ট হওয়া নারী ও বৃষ্টি
দাগী, দৃষ্টিহীন শীষের মতো লকলক করে চেয়ারম্যান
চেয়ারম্যানের চোরা চিন্ময় জিহবা…
যেনো চোখে ভাসে খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগ্ণ রোড
আনন্দ-অশ্রু, ম্লান শিশির কণা ভাঙে কুমারী মন
আর এইভাবে আর্তনাদ ওঠে অবহেলিত
পৃথিবীর পুষ্টিহীন পিঠে, ফসলের মাঠে, খালে-বিলে
কাশবনে
এবং আমি একা এখানে হেঁটে যাই অন্ধ চোখে
খোয়া ওঠা অমাবস্যা রুগ্ণ রোড, কালিক মেশানো পুষ্টিহীন গাছ-মাছ
রাত-রৌদ্র, পচা আম-আপেল সব আমারই থেকে যায়
থেকে যায় অসহায়, আর্তনাদ ভেজা ভারবাহী বৃষ্টির মতো
পৃথিবী বাড়ন্ত বৃক্ষ ও ঝরনা হবে
তোমরা নদীর জলে রৌদ্রের সার দাও
ঢেউ লাগাও মাটির মার্গণ মউলে
এবং দেখে নিঅ রাত্রিরে, একদিন
নদী ও মাটিরা গর্ভবতী হলে
মানুষ ফিরে পাবে কল্যাণময় কস্তুরি রাত
তোমরা রেলের দৌড়ের সাথে পাল্লা দাও
পাল্লা দাও কোনো এক সগন হৃদয়হীন ঘড়ির কাঁটার সাথে
তোমরা পাল্লা দিলে গাছেরা ফিরে পাবে
বর্ণালী বরাঙ্গ বোধ ও জলের উত্তাল তরঙ্গ
তোমরা আদ্র-কোমল ষড়ৈশ্বর্য শব্দের দিকে হাত বাড়াও
হাত বাড়াও সোনালি চাঁদ ও প্রজাপতির ডানার দিকে
তোমরা হাত বাড়ালে বাতাসের সাথে উড়ে যাবে
সুরভিত প্রতারক পাপড়ির দীর্ঘশ্বাস
এক ষাড়যন্ত্রিক নদীর জীবন
তোমরা আকাশে সূর্যের দিকে তাকাও
আমি সূর্যকে স্বর্ণের থালা বানিয়ে দিয়েছি
সূর্য থালা হলে তোমরা বাড়িতে বাড়ন্ত বৃক্ষ পাবে
এবং এখন প্রতারক পাখি, পাখিদের ফিরে যাওয়ার কথা
পাখিরা ফিরে গেলে আজই
আম্বর-মেশকে মেশানো পৃথিবী ঝরনা হবে
এই কবিতাগুলো পড়ে বারবার মনে হয়, কবি প্রকৃতি লিখছেন না, তিনি মানুষের ফিরে আসার পথ চিহ্নিত করছেন। নদী, পাখি, রৌদ্র আর ঝরনার ভেতর দিয়ে তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষের ভবিষ্যৎ কোনো দূরত্বে নয়, নিজের ভেতরেই। এই জন্মদিনে কবির প্রতি আমার কামনা একটাই—এই নীরব, একগুঁয়ে, মানবিক ভাষা যেন আরও দীর্ঘদিন আমাদের পথ দেখায়।
রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
এফপি/এমআই