নাগরিকরা সচেতন হলে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রায় অর্ধেক এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ-২০২৬-এর ফলাফলে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) নগর ভবন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জরিপের ফলাফল ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১২ দিন এ কার্যক্রম চলে। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এতে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন।
জরিপের তথ্য সংগ্রহে আধুনিক ‘কোবো টুলবক্স’ (KoboToolbox) ব্যবহার করা হয়। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে ব্রেটো ইনডেক্স (BI), হাউস ইনডেক্স (HI), কন্টেইনার ইনডেক্স (CI) ও পিউপা ইনডেক্স (PI) ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সূচকের মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থল ও ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, লার্ভার ঘনত্ব বিবেচনায় ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডকে তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো ১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ ও ৭১ নম্বর ওয়ার্ড।
মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড।
সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো ৩, ৭, ১৭, ২৮, ৩৪, ৪১, ৪২, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৭২ ও ৭৪ নম্বর ওয়ার্ড।
জরিপে পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। বাড়ির ধরন অনুযায়ী বহুতল ভবনে ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ, স্বতন্ত্র বাড়িতে ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়িতে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, খালি প্লটে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং নির্মাণাধীন বাড়িতে ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
জরিপে আরও দেখা যায়, লার্ভার উপস্থিতির মধ্যে প্লাস্টিকের বালতিতে ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ, প্লাস্টিকের ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ পাওয়া গেছে। ডিএসসিসির দাবি, এসব প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার ও জমে থাকা পানি অপসারণ করা হলে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রায় ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এডিস মশার বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ জন্য নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সঠিক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি আরও জানান, জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া প্রতি শনিবার ডিএসসিসির নিয়মিত ‘ক্লিনিং ডে’ কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর আঙিনা ও শৌচাগার পরিষ্কারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান, সচিব মো. মশিউর রহমান খান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমানসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এফপি/মিব