Dhaka, Wednesday | 4 November 2026
         
English Edition
   
Epaper | Wednesday | 4 November 2026 | English
শিরোনাম:

কালীগঞ্জের একই গ্রামের চার প্রতিবন্ধীর জীবনসংগ্রাম, প্রয়োজন মানবিক সহযোগিতা

প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৫০ পিএম  (ভিজিটর : ৫)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের উল্লা গ্রামে চার প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন কাটছে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। দারিদ্র্য, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাঁদের। কারও প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ও কানে শোনার যন্ত্র, কারও চলাচলের জন্য হুইলচেয়ার। আবার কেউ ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বাবার বাড়ির জরাজীর্ণ ঘরে। সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও তা দিয়ে চিকিৎসা, চলাচল ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্বের মধ্যেই কাটছে তাঁদের জীবন।

সম্প্রতি উল্লা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আট বছর বয়সী আবু রায়হান, ২৭ বছর বয়সী সাথী খাতুন, ২১ বছর বয়সী আলী রাজ ও ৪০ বছর বয়সী সাক্ষী খাতুনের জীবনসংগ্রামের চিত্র। তাঁদের প্রত্যেকের সমস্যা ও প্রয়োজন আলাদা হলেও সবারই প্রয়োজন একটু সহযোগিতা।
আবু রায়হানের স্বপ্ন শুনতে পাওয়া, স্কুলে ফেরা

উল্লা গ্রামের আসাদুল ইসলাম ও সিমা খাতুন দম্পতির বড় সন্তান আবু রায়হান। আট বছর বয়সী শিশুটি শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী। জন্মের পর দুই বছর বয়সে বাবা-মা বুঝতে পারেন, অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে সে শুনতে ও কথা বলতে পারছে না।

আসাদুল ইসলাম পেশায় ক্ষেতমজুর। দিনমজুরির সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে চলে তাঁর সংসার। সন্তানের চিকিৎসার জন্য ধারদেনা করে বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে ছুটেছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি।

আবু রায়হানের কানে শোনার জন্য হিয়ারিং এইড বা শ্রবণযন্ত্র প্রয়োজন। পরিবারটির ভাষ্য, বিভিন্ন মানের শ্রবণযন্ত্রের দাম ৩০ হাজার টাকা থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু দরিদ্র এই পরিবারের পক্ষে প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রের অভাবে শিশুটির স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। স্কুলে গেলে সহপাঠীদের কেউ কেউ তাকে কথা বলতে না পারার কারণে উপহাস করে। এতে মানসিকভাবে কষ্ট পেয়ে এখন আর স্কুলে যেতে চায় না সে।

আবু রায়হানের মা সিমা খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলেটা অন্য শিশুদের মতো শুনতে ও কথা বলতে পারে না। ওর চিকিৎসার জন্য অনেক জায়গায় গিয়েছি। ধারদেনা করে চিকিৎসা করিয়েও কোনো সমাধান করতে পারিনি। এখন আর সামর্থ্য নেই। একটা ভালো হিয়ারিং মেশিন কিনে দিতে পারলে হয়তো ও কিছুটা শুনতে পারবে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। আমরা চাই, আমাদের ছেলে পড়াশোনা করুক, অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশুক। কিন্তু টাকার অভাবে কিছুই করতে পারছি না। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে ছেলের চিকিৎসা এবং শ্রবণযন্ত্রের জন্য সহযোগিতা চাই।’

পরিবারটি জানায়, আবু রায়হান প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্র কেনার খরচ মেটানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।
সাথী খাতুনের প্রয়োজন চিকিৎসা ও হুইলচেয়ার

আবু রায়হানদের বাড়ির পাশেই থাকেন ২৭ বছর বয়সী সাথী খাতুন। তিনি ফরাদ উল্লাহ ও রেবেকা খাতুন দম্পতির মেয়ে। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সাথী সবার বড়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই মাস বয়সে একটি টিকা দেওয়ার পর থেকে সাথী অসুস্থ হতে থাকেন। তবে টিকার সঙ্গে তাঁর শারীরিক সমস্যার কোনো চিকিৎসাগত সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বর্তমানে কোমরের নিচের অংশ কার্যত অচল। নিজে হাঁটাচলা করতে পারেন না। কথা বলতেও তাঁর সমস্যা হয়।

সাথীর বাবা পেশায় কৃষক। মেয়ের চিকিৎসার আশায় নিজেদের জমিজমা বিক্রি করে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু তাতে প্রত্যাশিত ফল পাননি। বর্তমানে বসতভিটা ছাড়া তাঁদের তেমন কোনো সম্পদ নেই। তিন মাস পরপর পাওয়া প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ দিয়ে মেয়ের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাথীর মা-বাবা বলেন, ‘মেয়েটার জন্মের পর থেকেই আমরা অনেক কষ্ট করছি। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমিজমা বিক্রি করে দিয়েছি। এখন আর্থিক সামর্থ্য নেই। মেয়েটা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না, চলাফেরাও করতে পারে না। একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার পেলে অন্তত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করতে পারত। সরকার ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের কাছে মেয়ের চিকিৎসা এবং একটি হুইলচেয়ারের জন্য সহযোগিতা চাই।’
আলী রাজের চলার পথেও বাধা

সাথী খাতুনের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে দেখা মেলে ২১ বছর বয়সী আলী রাজের। দুই হাতে লাঠি ভর দিয়ে কষ্ট করে হাঁটেন তিনি। কখনো এক পা, কখনো অন্য পা টেনে নিয়ে চলতে হয় তাঁকে। জীবিকার নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয়।

আলী রাজ উল্লা গ্রামের তারিক হোসেন ও আন্না খাতুন দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে বড়। তাঁকে কালীগঞ্জ শহরের একটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থসংকট ও সহপাঠীদের উপহাসের কারণে একপর্যায়ে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আলী রাজের মা মারা যান। স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তারিক হোসেনের সঞ্চিত অর্থ ও সম্পদ শেষ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। বর্তমানে বসতভিটা ছাড়া তেমন কিছুই নেই তাঁর।

আলী রাজের বাবা তারিক হোসেন বলেন, ‘আমি অত্যন্ত গরিব মানুষ। স্ত্রীর ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন ভিটেবাড়ি ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। ছেলেটা ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারে না। তার চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও আমার নেই। তিন মাস পরপর যে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়, তা দিয়ে প্রয়োজন মেটে না। ছেলের জন্য একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে তার কষ্ট কিছুটা কমত। আমি সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা চাই।’

আলী রাজের প্রতিবেশী কালাম বলেন, ‘ছেলেটাকে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি। তার চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হয়। পরিবারের অবস্থাও ভালো নয়। মায়ের মৃত্যুর পর তাদের কষ্ট আরও বেড়েছে। আলী রাজের জন্য একটি হুইলচেয়ার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে সে কিছুটা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারত। এলাকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে সবার এগিয়ে আসা উচিত।’
স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর বাবার বাড়িতে আশ্রয় সাক্ষীর

আলী রাজদের বাড়ির পাশেই থাকেন ৪০ বছর বয়সী সাক্ষী খাতুন। জন্ম থেকেই তাঁর দুটি পা নেই। দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে অতি কষ্টে চলাফেরা করেন তিনি। উল্লা গ্রামের দরিদ্র কৃষক নুর ইসলাম ও লিলি খাতুন দম্পতির মেয়ে সাক্ষী। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

প্রায় সাত বছর আগে পাশের কোলা ইউনিয়নের আকির হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় সাক্ষীর। তাঁদের সংসারে রয়েছে চার বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান। তবে বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যান। পরে অন্যত্র বিয়ে করে সংসার করছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এরপর থেকে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন সাক্ষী। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে একটি জরাজীর্ণ ঘরে কোনোমতে দিন কাটছে তাঁদের। নিজের চলাফেরা, মেয়ের লালন-পালন ও সংসারের খরচ জোগাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে একা চলাফেরা করাও তাঁর জন্য কঠিন।

সাক্ষী খাতুনের বাবা নুর ইসলাম বলেন, ‘আমার মেয়ের জন্ম থেকেই দুটি পা নেই। তারপরও মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম তার একটা সংসার হবে। কিন্তু স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন ছোট্ট নাতনিকে নিয়ে আমার বাড়িতে থাকে। আমিও গরিব কৃষক। নিজের সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। মেয়ের জন্য আলাদা করে কিছু করার সামর্থ্য নেই। তিন মাস পরপর যে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়, তা দিয়ে সংসার চলে না। মেয়ের চলাচলের জন্য একটি হুইলচেয়ার এবং নাতনিকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’

সাক্ষীর মা লিলি খাতুন বলেন, ‘মেয়েটার কষ্ট দেখলে বুক ফেটে যায়। জন্মের পর থেকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি। ভেবেছিলাম বিয়ের পর তার কষ্ট কিছুটা কমবে। কিন্তু এখন মেয়েটা ছোট শিশুকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছে। আমরা বুড়ো মানুষ, কত দিন আর তাকে সাহায্য করতে পারব জানি না। মেয়ের জন্য একটি হুইলচেয়ার ও স্থায়ীভাবে বেঁচে থাকার মতো একটা ব্যবস্থা হলে অন্তত তার কষ্ট কিছুটা কমত।’
প্রয়োজন সহমর্মিতা ও কার্যকর সহযোগিতা

উল্লা গ্রামের এই চারজনের প্রয়োজন এক নয়। আবু রায়হানের প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা ও শ্রবণযন্ত্র। সাথী খাতুন ও আলী রাজের প্রয়োজন চিকিৎসার পাশাপাশি চলাচলের উপযোগী হুইলচেয়ার। অন্যদিকে সাক্ষী খাতুনের প্রয়োজন একটি হুইলচেয়ার, ছোট মেয়েকে নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা এবং আর্থিক সহায়তা।

পরিবারগুলোর ভাষ্য, তাঁরা সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। কিন্তু বর্তমান বাজারদর, চিকিৎসার ব্যয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের তুলনায় এই অর্থ অপ্রতুল। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, যাতায়াত ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা।

কালীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘জামাল ইউনিয়নের উল্লা গ্রামের এই চারজনেরই প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র রয়েছে এবং তাঁরা সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। আবু রায়হানের চিকিৎসা ও কানে শোনার যন্ত্রের প্রয়োজনের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তার পরিবার আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানানো হবে। অন্য তিনজনের চিকিৎসা ও হুইলচেয়ারের প্রয়োজনের বিষয়েও তাঁরা আবেদন করলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানানো হবে। সরকারি নিয়ম ও বরাদ্দ অনুযায়ী তাঁদের সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

প্রতিবন্ধিতা কোনো মানুষের অক্ষমতার পরিচয় নয়; প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, চিকিৎসা, সহায়ক উপকরণ ও সামাজিক সহযোগিতা। উল্লা গ্রামের আবু রায়হান, সাথী খাতুন, আলী রাজ ও সাক্ষী খাতুনের জীবনসংগ্রাম সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবী সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে তাঁদের জীবনযাত্রা অনেকটাই সহজ হতে পারে। পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।

এফপি/মিব
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝