মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হতে যাচ্ছে আগামী ৫ নভেম্বর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা বন্দর সফরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। এ সফরে বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-০১ মো. উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত সরকারি সফরসূচি অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে সরাসরি বাগেরহাটের মোংলা বন্দরে পৌঁছাবেন। সেখানে তিনি মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি কনটেইনার জেটি নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
এ ছাড়া ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ও চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিআরসিসি) মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী।
মোংলা বন্দরের কর্মসূচি শেষে তিনি সড়কপথে বাগেরহাটে হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার শরিফ জিয়ারত করবেন। এরপর খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সেখানে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭ (সিজন-২)’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
এটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফর। সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা থাকবেন।
বদলে যেতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চিত্রমোংলা বন্দরকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাণিজ্যিক বন্দরে পরিণত করার উদ্যোগকে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, পণ্য ওঠানামার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি, লজিস্টিকস ও বিভিন্ন সেবামূলক খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে। এর ফলে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দক্ষিণ -পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বেকার তরুণদের জন্য বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন পেশায় কাজের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পমোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বন্দরটির সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির আওতায় প্রকল্পটির অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনের অর্থায়ন ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ৪৭৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্যের নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং বিপজ্জনক পণ্য (ডেঞ্জারাস কার্গো) হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়া আধুনিক পণ্য ওঠানামার জন্য ৪৯টি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রতি ঘণ্টায় ৩০টির বেশি কনটেইনার ওঠানামার সক্ষমতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বেড়ে চার লাখ টিইইউতে উন্নীত হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা ও গুরুত্ব বাড়বে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনামোংলা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মানিক প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বন্দরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর মোংলাবাসীর জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও আশাব্যঞ্জক। মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
তিনি আরও বলেন, “বন্দরকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে। মোংলা তথা পুরো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের দিকনির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সফল করতে মোংলা পৌর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।”
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকা আরও সচল হবেবাগেরহাট-৩ (মোংলা-রামপাল) আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “আগামী ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মোংলা বন্দর সফর এবং বন্দরের আধুনিকায়নে নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “মোংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারিত হবে। বন্দরকে ঘিরে নতুন শিল্প-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে, বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হবে এবং মোংলা-রামপালসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চল উপকৃত হবে। এই উন্নয়নের সুফল একসময় সারা দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ মোংলা বন্দর ও সুন্দরবন পরিদর্শন করেন। ওই সফরে তিনি মোংলা বন্দরের জেটি ও সার্বিক পরিচালন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। এ সময় বন্দরের আধুনিকায়ন, অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরকে কেন্দ্র করে নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উন্নয়নকাজ যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও আরও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে।
এফপি/মিব