দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্বীপে পর্যটন ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটলেও এখন পর্যন্ত সেখানে গড়ে ওঠেনি কোনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। নেই অগ্নিনির্বাপণে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত জনবলও। ফলে প্রায় দেড় শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নিয়ে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রটি অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আসন্ন পর্যটন মৌসুমে দ্বীপে মিনি ফায়ার সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে শিগগিরই জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের উদ্যোগে একটি মতবিনিময় সভা আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত সেন্টমার্টিনের নতুন পর্যটন মৌসুম। এ মৌসুম চলবে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এ বছর প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। তবে পর্যটন মৌসুম শুরুর আনন্দ- উচ্ছ্বাসের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দ্বীপটির ব্যাপক পরিচিতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও অগ্নিনির্বাপণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় ‘টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর সেন্টমার্টিনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ইনানীর ঘটনার পরও দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে দৃশ্যমান কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অতীতের অগ্নিকাণ্ড, বাড়ছে আতঙ্কসেন্টমার্টিনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভোরে দ্বীপের পশ্চিম সৈকতের গলাচিপা এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তিনটি রিসোর্টের ২৬টি কক্ষ সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। প্রবালদ্বীপের তীব্র বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বালু ও সাধারণভাবে পানি ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
স্থানীয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দ্বীপে আগুন লাগলে মূল ভূখণ্ড থেকে ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই। টেকনাফ বা কক্সবাজার থেকে সাহায্য আসার অপেক্ষায় থাকলে পুরো দ্বীপ পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে। পর্যটক ও স্থানীয়দের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে অন্তত ছোট পরিসরে হলেও একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ইউনিট চালু করা জরুরি।”
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, অতীতের অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দ্বীপে সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
তবে শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখলেই অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল। স্থানীয় ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, “শুধু দেয়ালে একটি সিলিন্ডার ঝুলিয়ে রাখলেই আগুন নেভানো যায় না। এসব যন্ত্র আদৌ কার্যকর আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আগুন লাগলে সেগুলো ব্যবহারের জন্য হোটেলগুলোতে প্রশিক্ষিত কর্মী থাকতে হবে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দ্বীপের অধিকাংশ হোটেলেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নেই। জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটক ও কর্মীদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক স্থাপনায় পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথও নেই। এ ছাড়া রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টেকনাফ ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনের উদ্যোগএ বিষয়ে টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, “সেন্টমার্টিনে বর্তমানে ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্টেশন বা প্রশিক্ষিত জনবল নেই। বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করতে আমাদের একটি দল দ্বীপটি পরিদর্শনে যাবে। পরিদর্শনের পর আমরা বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রদান করব।”
স্থানীয়দের পাঁচ দফা দাবিসেন্টমার্টিনে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে স্থানীয় বাসিন্দারা পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হলো —
১. অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ইউনিট স্থাপন: পর্যটন মৌসুমের সাড়ে চার মাস দ্বীপে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ অন্তত একটি অস্থায়ী ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করতে হবে।
২. বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরিদর্শন: ১ নভেম্বরের আগেই দ্বীপের প্রতিটি হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ উদ্যোগে পরিদর্শন করতে হবে।
৩. মহড়া ও প্রশিক্ষণ: প্রতিটি হোটেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহারের বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন করতে হবে।
৪. অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: প্রতিটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, সুরক্ষিত রান্নাঘর এবং পর্যাপ্ত জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. স্থায়ী তদারকি কমিটি গঠন: অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম সচল ও কার্যকর রয়েছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি স্থায়ী নজরদারি কমিটি গঠন করতে হবে।
কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সেন্টমার্টিনকে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ করতে শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ করলেই হবে না, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পর্যটন মৌসুম শুরুর আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এখনই কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ইনানীর মতো কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সেন্টমার্টিনেও ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারবে না।
অন্যদিকে পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেন্টমার্টিনে মিনি ফায়ার সার্ভিস চালুর বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বীপে মিনি ফায়ার সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিগগিরই জেলা প্রশাসক সেন্টমার্টিন পরিদর্শনে যাবেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক সভা করবেন।
এফপি/মিব