পর্যটন মৌসুম শুরুর এক মাস তিন দিন পর পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে প্রবাল-দ্বীপ সেন্টমার্টিন। আগামী ১ নভেম্বর থেকে দ্বীপটিতে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এবার গত বছরের তুলনায় পর্যটন মৌসুমের সময়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি দৈনিক পর্যটকসংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বীপে যাতায়াত করতে পারবেন পর্যটকেরা।সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজারের পরিবর্তে সাড়ে তিন হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো পর্যটন মৌসুমেই দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ থাকবে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে ১০০ টাকা ফি নেওয়া হবে। এ ছাড়া দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জারি করা নির্দেশনাগুলোও পর্যটকদের মেনে চলতে হবে।
সরকারের এসব সিদ্ধান্তে দ্বীপবাসী ও পর্যটকদের মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। আট মাসের বেশি সময় পর্যটকশূন্য থাকার পর দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা পর্যটক বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিষ্কার- পরিচ্ছন্নতা, সংস্কার ও মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। অন্যদিকে, পর্যটকেরাও জাহাজের টিকিট এবং হোটেল-রিসোর্টে কক্ষ বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ শুরু করেছেন।
তবে প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জাহাজ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমতি, পর্যটন বোর্ডের কিউআর কোডযুক্ত টিকিট ব্যবস্থা এবং রুট পারমিট পেতে বিলম্বের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পর্যটক, জাহাজমালিক ও দ্বীপের ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, নির্ধারিত পর্যটন মৌসুমের প্রথম সপ্তাহের কয়েকটি দিন নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসায়ীর আর্থিক ক্ষতি হবে।
সী ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটক পরিবহনের জন্য এমভি কর্ণফুলী, বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ জাহাজ ছাড়পত্র পেয়েছে। তিনটি জাহাজের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় দুই হাজার ৩০০ জন।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া গেলেও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভয়েজ লাইসেন্স এখনো হাতে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) রুট পারমিট ও সময়সূচিও ঘোষণা করা হয়নি। পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের স্থানীয় অনুমোদনও পাওয়া যায়নি। ফলে সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ১ নভেম্বর থেকে পর্যটক পরিবহন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
হোসাইন ইসলাম বাহাদুর আরও বলেন, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকদের টিকিট বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্ধারিত সফটওয়্যারের মাধ্যমে বুকিং করতে হবে। কিন্তু এখনো সফটওয়্যারটি চালু হয়নি। তবে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধান হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। পর্যটন মৌসুমের প্রথম চার-পাঁচ দিন কিছুটা জটিলতা থাকতে পারে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যটন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দপ্তরের অনুমতি প্রয়োজন। জাহাজ কর্তৃপক্ষ সব অনুমোদন সংগ্রহ করার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে জেলা প্রশাসন চূড়ান্ত অনুমতি দিয়ে থাকে। এখনো বেশ কয়েকটি অনুমোদন সম্পন্ন হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন দ্রুত দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, গতবারের মতো এবারও ট্রাভেল পাস নিয়ে পর্যটকদের সেন্টমার্টিন যেতে হবে। এ বিষয়ে কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে জাহাজমালিক ও সংশ্লিষ্ট সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে পর্যটনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, ১ নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতের পাশাপাশি পুরো সময় রাতযাপনের সুযোগ রাখার বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আগের সিদ্ধান্তে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তিও পরে সংশোধন করা হয়।
গত ২৫ অক্টোবরের সভার সিদ্ধান্ত ২৭ অক্টোবর সংশোধন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিষয়টি জানান। সংশোধিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নভেম্বর থেকে পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্টমার্টিনে রাতযাপন করতে পারবেন।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাও বহাল রাখা হয়েছিল।
ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকদের শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিনে গিয়ে একই দিন ফিরে আসার কথা ছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাখা হয়েছিল রাতযাপনের সুযোগ। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে পর্যটন মৌসুমের সময়সীমা বাড়লেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে আগের বিধিনিষেধ বহাল থাকছে বলে ধারণা তৈরি হয়। এ নিয়ে পর্যটক, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক ও জাহাজমালিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। পরে গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হলে রাতযাপনের বিষয়ে সংশোধিত সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, আগের মতোই কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় বিআইডব্লিউটিএর ঘাট থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। এবার দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি হিসেবে ১০০ টাকা নেওয়া হবে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত করার খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াত শুরু হলে দ্বীপে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে। সচল হবে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাড়বে স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগ। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে সময়মতো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু না হলে তাঁরা হতাশ হবেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সেন্টমার্টিন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। চলতি মৌসুমে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ড, বিজিবি, নৌবাহিনী ও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকবে। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। যেসব হোটেল ও রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, সেগুলোতে পর্যটনসেবা চালুর আগেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। মালিকেরাও প্রস্তুতি সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রস্তুতি না থাকলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের প্রজ্ঞাপনে সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—রাতে সমুদ্রসৈকত ও তৎসংলগ্ন এলাকায় আলো জ্বালানো যাবে না; উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করা বা বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না; কেয়াবনে প্রবেশ এবং কেয়া ফল সংগ্রহ, ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে না। এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের কোনো ধরনের ক্ষতি করা যাবে না। সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকের মতো যানবাহন চালানোও নিষিদ্ধ। পর্যটন মৌসুমেও এসব বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
এফপি/মিব