Dhaka, Thursday | 29 October 2026
         
English Edition
   
Epaper | Thursday | 29 October 2026 | English
শিরোনাম:

২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মধ্যরাত থেকে মাছ ধরতে নামছেন হাতিয়ার জেলেরা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪০ পিএম আপডেট: ২৯.১০.২০২৬ ১:৫১ পিএম  (ভিজিটর : ৩৫)
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

দীর্ঘ ২২ দিনের বিরতি শেষে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার মাছঘাটগুলোতে। মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ২৯ অক্টোবর দিবাগত রাত ১২টায়। এরপরই মেঘনা নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। দীর্ঘদিন পর নদীতে ফেরার সুযোগ পেয়ে জেলেপল্লিগুলোতে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। একই সঙ্গে মাছঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যও সচল হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা।

নৌকা-ট্রলার মেরামত, জাল গোছানো, ইঞ্জিন পরীক্ষা, জ্বালানি সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় খাবারসামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে হাতিয়ার বিভিন্ন মাছঘাটে বেড়েছে মানুষের আনাগোনা।

হাতিয়ার বহু মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাছ ধরার পেশার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জেলেদের পাশাপাশি মাছের আড়ত, বরফকল, মুদি দোকান ও খাবারের হোটেলসহ ঘাটকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও কার্যক্রম কমে গিয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবরে এসব পেশার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাতিয়ার সূর্যমুখী ঘাটসহ বিভিন্ন মাছঘাটে দেখা গেছে জেলেদের ব্যস্ততা। কেউ নৌকায় জাল তুলছেন, কেউ ছিঁড়ে যাওয়া জাল মেরামত করছেন। আবার কেউ ইঞ্জিন পরীক্ষা ও জ্বালানি সংগ্রহে ব্যস্ত। দীর্ঘ বিরতির পর নদীতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ঘাটগুলোতে ফিরেছে চেনা কর্মচাঞ্চল্য।

সূর্যমুখী ঘাটের প্রবীণ জেলে জানে আলম (৬৭) বলেন, “অনেক দিন পর মাঝি-মাল্লারা আবার ঘাটে এসেছেন। ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় সবাই বাড়িতে ছিলেন, অনেকে অন্য কাজ করেছেন। এখন রাত ১২টার পর নদীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সবাই। কেউ নৌকা ঠিক করছেন, কেউ জাল তুলছেন, আবার কেউ ইঞ্জিনের জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। অনেক দিন পর ঘাটে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।”

দীর্ঘদিন মাছ ধরতে না পারায় জেলেদের মধ্যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, নদীতে ফেরার সুযোগ পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে স্বস্তিও ফিরেছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া গেলে সেই আয় দিয়ে সংসারের খরচ মেটানো এবং পুরোনো দেনা পরিশোধের আশা করছেন তাঁরা।

সূর্যমুখী ঘাটের জেলে নুর উদ্দিনের পরিবারের সদস্য আটজন। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় গত ২২ দিন তাঁর নিয়মিত উপার্জন বন্ধ ছিল। সরকারি সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি চাল পেলেও পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

নুর উদ্দিন বলেন, “২২ দিন কোনো আয় ছিল না। পরিবারে আটজন সদস্য। সরকারি সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি চাল পেয়েছি, কিন্তু শুধু চাল দিয়ে তো সংসার চলে না। তেল, লবণ, ডাল, সবজিসহ নানা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়েছে। বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এখন নদীতে যাওয়ার জন্য ঘাটে এসেছি। আশা করছি, মাছ ধরতে পারলে সংসারের কষ্ট কিছুটা কমবে।”

তাঁর মতো হাতিয়ার অনেক জেলে পরিবারকেও একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও সংসারের খরচ বন্ধ হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও পুরোনো দেনা পরিশোধের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক আয়ের ধারায় ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।

জেলেরা জানান, মাছ ধরতে যাওয়ার আগে নৌকা ও জালের অবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি ইঞ্জিনের জ্বালানি, খাবার, পানীয় জল এবং নদীতে অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন নৌকা ব্যবহার না করায় কোথাও কোথাও মেরামতের প্রয়োজনও দেখা দিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কেমন হবে, তা নিয়ে জেলেদের মধ্যে প্রত্যাশার পাশাপাশি কিছুটা অনিশ্চয়তাও রয়েছে। তবে দীর্ঘ বিরতির পর মাছ ধরার সুযোগ ফিরে পাওয়ায় তাঁরা নতুন উদ্যমে নদীতে নামতে প্রস্তুত।

জেলেদের পাশাপাশি মাছঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যেও ব্যস্ততা বেড়েছে। মাছের আড়ত, বরফকল, মুদি দোকান ও খাবারের হোটেলগুলো পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। জেলেরা মাছ নিয়ে ফিরলে বেচাকেনা বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

কাজির বাজার ঘাটের ব্যবসায়ী আবদুস শহিদ বলেন, “মাছের আড়ত, মুদি দোকান, ঘাটের খাবারের হোটেল, বরফকলসহ মাছঘাটকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষের জীবিকা চলে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা কমে গিয়েছিল। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় সবাই আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। জেলেরা মাছ নিয়ে ফিরলে ঘাটে বেচাকেনা বাড়বে। এতে জেলেদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরাও উপকৃত হবেন।”

মাছ ধরা শুরু হলে নৌকা থেকে মাছ নামানো, আড়তে বেচাকেনা, বরফ সরবরাহ, মাছ পরিবহন ও বাজারজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে কর্মব্যস্ততা বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরা শুরু হওয়া শুধু জেলেদের জন্য নয়, পুরো ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হাতিয়ায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। তাঁদের মধ্যে ১৫ হাজার জেলে পরিবারকে নিষেধাজ্ঞাকালীন সরকারি সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে দুস্থ ও অসহায় পরিবার বাছাই করে এ চাল বিতরণ করা হয়। ইতোমধ্যে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।

তবে জেলেদের অভিযোগ, ২২ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় পরিবারের খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর জন্য যে পরিমাণ সহায়তা প্রয়োজন, তা তাঁরা পাননি। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সদস্যসংখ্যা বেশি এবং বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নেই, তাদের দুর্ভোগ ছিল বেশি। সরকারি সহায়তার বাইরে থাকা অনেক পরিবারকেও ধারদেনা করে চলতে হয়েছে।

জেলেদের মতে, মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ সময়ে জেলেদের পরিবার যাতে খাদ্যসংকটে না পড়ে, সে জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে জেলেরা নিষেধাজ্ঞা পালনে উৎসাহিত হবেন এবং তাঁদের পরিবারের আর্থিক চাপও কিছুটা কমবে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে হাতিয়ায় নদীতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল। উপজেলা মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বেশ কয়েকটি ট্রলার ও জেলেকে আটক করা হয় এবং মাছ জব্দ করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জেল ও জরিমানা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে নির্ধারিত সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা জরুরি। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি চালিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হওয়ার আগে মাছ ধরতে নামার সুযোগ নেই।

হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, “২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে। এরপর জেলেরা নদীতে গিয়ে মাছ শিকার করতে পারবেন। এর আগে কাউকে নদীতে নামতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ রয়েছে।”

দীর্ঘ ২২ দিনের বিরতি শেষে এখন হাতিয়ার জেলেদের চোখ নদীর দিকে। নৌকা-জাল প্রস্তুত, ঘাটে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য, ব্যবসায়ীরাও অপেক্ষায় রয়েছেন মাছের সরবরাহ বাড়ার। তবে নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত হওয়া—দুটিই জেলেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের প্রত্যাশা, নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছের প্রাপ্যতা বাড়বে, সচল হবে ঘাটকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন তাঁরা।

এফপি/মিব
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝