১৭ আগস্ট ২০০৫—সেই দিনটাও ছিল বুধবার। হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণের। বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই মাত্র ৪৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সেই অনাড়ম্বর ও আকস্মিক অভিষেকের পর কে ভেবেছিল, এই তরুণের হাত ধরেই একদিন ফুটবল বিশ্ব এক নতুন রূপকথার জন্ম দেবে?
ক্যালেন্ডারের পাতায় কেটে গেছে হাজারেরও বেশি বুধবার। তরুণ মেসি থেকে তিনি একে একে হয়ে উঠেছেন ফুটবলের জাদুকর, মহানায়ক, সর্বকালের সেরা এবং বিশ্বজয়ী মহাতারকা। দীর্ঘ ২১ বছর পর অবশেষে সেই না চাওয়ার বুধবারটি (বাংলাদেশ সময়) এসে গেল। আজ ৭ অক্টোবর ২০২৬, ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেললেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের এই জয়ের প্রতিটি উৎসবেই জড়িয়ে রইল তাঁর জাদুকরী ছোঁয়া—একটি গোল করার পাশাপাশি করিয়েছেন আরও দুটি গোল। সব মিলিয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল ও ৭০ অ্যাসিস্টের অবিশ্বাস্য এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের ইতি টেনে আকাশী-সাদা জার্সিকে চিরবিদায় জানালেন ফুটবলের এই বরপুত্র।
ম্যাচের আগের দিনগুলো থেকেই বুয়েনস আইরেস ও মেসির জন্মশহর রোজারিওতে ছিল উৎসবের আমেজ আর এক বুক চাপা কান্নার আবহ। রোজারিওর ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ মেমোরিয়ালে জার্মান ক্রীড়াসামগ্রী জায়ান্ট অ্যাডিডাসের উদ্যোগে টাঙানো হয়েছিল প্রায় ৩০ মিটার দীর্ঘ এক বিশাল জার্সি, যেখানে সোনালি রঙে খচিত ছিল ‘গ্রাসিয়াস’ ও তার অমর ‘১০’ নম্বর। অন্যদিকে, এএফএ আয়োজিত বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্টেডিয়ামের প্রকাণ্ড স্ক্রিনে তার সোনালী ক্যারিয়ারের নানা রোমাঞ্চকর মুহূর্তের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই ঐতিহাসিক রাত।
নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আধা ঘণ্টা দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচের প্রথমার্ধে বেনিনের সুসংগঠিত রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় গোলের দেখা পেতে বেশ কসরত করতে হয় আলবিসেলেস্তাদের। তবে খেলার মাঝে এল এক অনন্য মুহূর্ত। মেসির সম্মানে ম্যাচের ঠিক দশম মিনিটে খেলা থামিয়ে দেন রেফারি। এ সময় গ্যালারির দর্শকেরা দুই মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে সমস্বরে হাততালি ও ‘ওলে ওলে মেসি’ স্লোগানে চিরদিনের সেরাকে অভিবাদন জানান। মাঠে থাকা দুই দলের খেলোয়াড়েরাও খেলা থামিয়ে মেসির কাছে এসে হাত মিলিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান, আর স্টেডিয়ামজুড়ে তখন ফোটানো হয় বর্ণিল আতশবাজি। এরপর খেলার বাকি সময় প্রথমার্ধে আক্রমণগুলো বারবার প্রতিহত হলে গোলশূন্য থেকেই শেষ হয় প্রথমার্ধের খেলা।
তবে খেলার দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায় দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই। ম্যাচের ঠিক ৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার কিক থেকে দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সেনানি নিকোলাস ওতামেন্দি দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়িয়ে ডেডলক ভাঙেন (১-০)। মেসির সঙ্গে এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারও এদিন আলবিসেলেস্তের জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন, যা এই গোলের আনন্দকে এক আবেগঘন মাত্রায় রূপ দেয়।
আর ম্যাচের ৭১ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোলের পথ তৈরি করার পর এবার নিজেই গোল উৎসবে মেতে ওঠেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বক্সে অগাস্টিন জিয়াই ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট কিক নিতে বল যখন সাদা দাগের ওপর বসালেন, তখন গোটা স্টেডিয়ামের বুক চিরে বয়ে গেল এক পিনপতন নীরবতা আর তীব্র প্রত্যাশা। ৭১ মিনিটে মেসির নেওয়া সেই শট ঠেকানোর বিন্দুমাত্র উপায় ছিল না বেনিনের গোলরক্ষকের। গোলরক্ষক ভুল দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই বুলেট গতির জোরালো বলটি গিয়ে আশ্রয় নেয় জালের ওপরের কোণায়। এটি ছিল তার বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম গোল! গোল করার সঙ্গে সঙ্গেই আবেগাপ্লুত সতীর্থরা ছুটে এসে তাদের মহাতারকাকে মাঝমাঠে এক বৃত্তের মাঝে ঘিরে ধরে মেতে ওঠেন উল্লাসে, যা রূপ নেয় এক ঐতিহাসিক উদযাপনে।
ম্যাচের ঘড়ির কাঁটা যখন ৯০ মিনিটের কোটা পেরিয়ে ইনজুরি টাইমের অন্তিম মুহূর্তে এসে ঠেকেছে, তখনো মাঠে ছিল শেষ মুহূর্তের সেই চেনা উত্তাপ। ৯৩ মিনিটে বেনিনের ফুটবলারদের ফাউলের সুবাদে আর্জেন্টিনা পায় একটি ফ্রি-কিক। ম্যাচের একেবারে শেষ সুযোগ হিসেবে ৯৫ মিনিটে নিজের ট্রেডমার্ক বাঁ পায়ের শটে সরাসরি লক্ষ্যভেদ করার চেষ্টা করেন মেসি; তবে বল ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায়। এর ঠিক পরপরই বেজে ওঠে ম্যাচ শেষের সেই কাঙ্ক্ষিত ও অবধারিত বাঁশি। বেনিনকে ৩-০ গোলের পরিষ্কার ব্যবধানে হারিয়ে জয়ের হাসিতেই আন্তর্জাতিক আঙিনাকে চিরবিদায় জানাল আর্জেন্টিনা।
তবে সেই শেষ বাঁশি কেবল একটি জয়ের সমাপ্তি টানেনি, বরং স্তব্ধ করে দিয়েছিল এস্টাডিও মনুমেন্তালে উপস্থিত সবাইকে। খেলা শেষের সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারিতে বেজে ওঠে বিউগলের করুণ ও বিষণ্ণ সুর, যার সঙ্গে মিশে যায় বিশ্বজুড়ে ছুটে আসা ভক্তদের বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল। হাজারো মানুষের আবেগে ভারী হয়ে ওঠে মনুমেন্তালের বাতাস। তবে রাতের সেই জমাট অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয়নি আধুনিক প্রযুক্তির আলো। বুয়েনস আয়ার্সের আকাশজুড়ে লেজার লাইটের নিখুঁত প্রজেকশনে ভেসে ওঠে মেসির বিদায়ী দৃশ্য, তাঁর অমর ১০ নম্বর জার্সি আর ভালোবাসার বার্তার ঝিলিক। মাঠের ঘাস থেকে আকাশের বুক, সবকিছু মিলিয়ে এক অপরূপ আলোয় লেখা হয়ে রইল এক কথা: সবুজ মাঠের রূপকথা হয়তো ফুরোল, কিন্তু জাদুকরের অমরত্ব রয়ে গেল চিরকালীন।
এফপি/অ