কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ বাড়ছে। চলতি সেপ্টেম্বরের ২৩ দিনে অন্তত ৪৭ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশ অসুস্থ গবাদিপশু জবাই, কাঁচা মাংস কাটাকাটি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের গাছেরদিয়াড় গ্রামের কৃষক মো. রফিকুল ইসলামও আক্রান্তদের একজন। পাশের বাড়ির একটি অসুস্থ গরু বাঁচানো যাবে না ভেবে জবাই করা হলে তিনি মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছার কাজে অংশ নেন। দুই-তিন দিন পর তাঁর হাত ও আঙুলে ছোট ছোট গুটি ও ফোস্কার মতো দাগ দেখা দেয়। পরে সেগুলো ক্ষতে পরিণত হয়ে মাঝখান কালো হয়ে যায়। পাশাপাশি তীব্র জ্বর ও শরীরব্যথা দেখা দিলে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত করেন।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অসুস্থ গরু জবাই করার পর মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছা করেছি। তখন বুঝতে পারিনি এভাবে রোগ ছড়াতে পারে। কয়েক দিন পর হাতে গুটি ওঠার পর তা কালো হয়ে ঘায়ে পরিণত হয়। এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকা নয়, দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকেই অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আসছেন। এর আগে উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামকে অ্যানথ্রাক্সের ‘রেড জোন’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বর্তমানে সংক্রমণ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চর্মরোগ চিকিৎসক ডা. এমদাদুল হক টোটন বলেন, সারা বছরই কমবেশি অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে আসেন। তবে ইদানীং সংক্রমণের মাত্রা বেড়েছে। আগে নির্দিষ্ট কিছু গ্রামকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এখন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগী আসছেন। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ও ব্যাপক জনসচেতনতা জরুরি।
দৌলতপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাকিব বলেন, অ্যানথ্রাক্স গবাদিপশুর একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা আক্রান্ত পশু থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। রোগটির বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে গবাদিপশুকে টিকা দেওয়া ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অসুস্থ পশু গোপনে জবাই ও বিক্রি করার প্রবণতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। কোনো পশুর শরীরে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে। একইভাবে মানুষের শরীরে অস্বাভাবিক গুটি, ফোসকা বা কালো ক্ষত দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাজার ও গ্রামে অসুস্থ পশু জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। এজন্য হাট-বাজারে পশু বিক্রি ও জবাই প্রক্রিয়ায় সরকারি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাস বলেন, আর্থিক ক্ষতির ভয়ে অনেক পশুর মালিক অসুস্থ গরু কম দামে বিক্রি কিংবা জবাই করে ফেলেন। পরে অসচেতনতার কারণে ওই পশুর কাঁচা মাংস কাটাকাটি ও ধোয়ামোছার সময় মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত পশু মারা গেলে তা খোলা জায়গায় না ফেলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদভাবে গভীর গর্তে পুঁতে ফেলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রি ঠেকাতে সচেতনতার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এফপি/র