চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ডলু নদী থেকে ‘স্বেচ্ছায় খনন’ কর্মসূচির আওতায় মাটি ও বালি উত্তোলনের যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে আগের অনুমতিপত্রটি বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি স্মারকের মাধ্যমে ডলু নদী খনন ও মাটি-বালি উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একই তারিখে জারি করা পৃথক স্মারকে আগের অনুমোদনটি ‘অনিবার্য কারণবশত’ বাতিল করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাতিলের চিঠিতে আগের স্মারক নম্বর উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে জারি করা ওই স্মারকটি অনিবার্য কারণবশত বাতিল করা হলো। চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন তৎকালীন সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান।
এর আগে ডলু নদীর সাতকানিয়া অংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ‘স্বেচ্ছায় খনন’-এর নামে জেগে ওঠা মাটি ও বালির ডিভি অপসারণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
অনুমোদনপত্র অনুযায়ী, গারাঙ্গিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা থেকে নলুয়া-আমিলাইষ তিন খালের মুখ পর্যন্ত নদীর অংশে জেগে ওঠা মাটি ও বালির ডিভি অপসারণের কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে অপসারণযোগ্য মাটির পরিমাণ ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ ঘনফুট নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে এ অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে নদী খননের কারিগরি প্রক্রিয়া, মাটি-বালুর পরিমাণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তদারকি নিয়ে। অনুমোদনপত্রে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে খননকাজ তদারকির কথা বলা হলেও পাউবোর কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এ ধরনের খননকাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারিগরি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের ওই অনুমোদনের আওতায় তাদের তদারকির সুযোগ নেই।
এদিকে অনুমোদন বাতিলের বিষয়টি নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। এর আগে ‘মেসার্স করিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের’ স্বত্বাধিকারী আবদুল করিম জানিয়েছিলেন, তারা অনুমোদন বাতিলের কোনো চিঠি পাননি এবং বৃষ্টি কমলে ডলু নদী থেকে মাটি-বালি উত্তোলনের কাজ শুরু করবেন।
এখন উপজেলা প্রশাসনের নথিতে অনুমোদন বাতিলের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বাতিলের সিদ্ধান্ত কবে এবং কীভাবে জানানো হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাতিলের চিঠিতে অনুমোদন বাতিলের কারণ হিসেবে শুধু ‘অনিবার্য কারণবশত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো কারণ বা কারিগরি আপত্তির বিস্তারিত সেখানে উল্লেখ নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— কারিগরি জটিলতা, তদারকি নিয়ে আপত্তি, নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক কারণে অনুমোদনটি বাতিল করা হয়েছে?
এ ব্যাপারে সদ্যবিদায়ী নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের কাছে মোবাইল ফোনে বাতিলের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নিয়ে আরো এনালাইসিস দরকার আছে যেহেতু ডলু খাল সেনসেটিভ ইস্যু। অনুমোদন বিষয়টি দেওয়ার পর আমাদের মনে হয়েছে এই বিষয়ে নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার সংস্থার সাথে বিশদ আলোচনা করা উচিত যেটি সময় স্বল্পতার কারণে আমি করতে পারি নাই বর্তমান ইউএনও হয়তো সবার সাথে বসে সব ঠিক করবে।
ডলু নদী দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি ঐতিহাসিক নদীপথ। একসময় এ নদীকে কেন্দ্র করে সাতকানিয়ায় নৌযোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছিল। বর্তমানে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং দখল-দূষণ থেকে নদীকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। তবে নদী খননের নামে বিপুল পরিমাণ মাটি ও বালি অপসারণের ক্ষেত্রে কারিগরি সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব, নদীর নকশা, উত্তোলনের পরিমাণ এবং সরকারি রাজস্বের বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুমোদন বাতিলের ফলে আপাতত ডলু নদী থেকে ওই অনুমোদনের ভিত্তিতে মাটি-বালি উত্তোলনের পথ বন্ধ হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—ভবিষ্যতে ডলু নদী খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটি কোন সংস্থার মাধ্যমে, কী কারিগরি সমীক্ষার ভিত্তিতে এবং কী শর্তে করা হবে?
এফপি/অ