Dhaka, Wednesday | 9 September 2026
         
English Edition
   
Epaper | Wednesday | 9 September 2026 | English
শিরোনাম:

মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের নমনীয়তা, কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে তরুণ খুন

প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩৪ পিএম  (ভিজিটর : ৬)

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মাদকের বিস্তার ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপট নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের মধ্যেই এবার ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল ১৯ বছরের এক তরুণের। ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে কিশোর গ্যাং সদস্যদের ছুরিকাঘাতে তাহমিদুল হাসাম হামীম নামে ওই তরুণকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে উপজেলার কেরানীহাট সিটি সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মো. রোহান উদ্দিন (১৯) নামে এক তরুণকে ঘটনার রাতেই স্থানীয় জনতা আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রোহান ছুরিকাঘাতের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তবে ঘটনার নেপথ্যে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য নাকি পূর্ববিরোধ—তা তদন্ত করে নিশ্চিত করা হচ্ছে। নিহত হামীম উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাসমত আলী সিকদার দোকানের পার্শ্ববর্তী আলী হাদি বাড়ির মৃত ফরিদুল আলমের ছেলে। গ্রেপ্তার রোহান একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দাবাদ কাজিরখীল এলাকার ওসমান গণির ছেলে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে রোহান আমিরাবাদ এলাকায় যাওয়ার পথে তার প্রতিবেশী শাহানুরসহ কয়েকজন তার সঙ্গে একটি গাড়িতে ওঠেন। পথিমধ্যে নিহত হামীমের সঙ্গে শাহানুর ও অন্যদের মারামারি হয়। এ সময় হামীম মারধরের শিকার হন এবং রোহান সেখানে মধ্যস্থতা করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। তবে হামীমের ধারণা হয়, রোহানের ইন্ধনেই তাকে মারধর করা হয়েছে। এ নিয়ে পরবর্তীতে রোহানকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এরপর হামীমের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হাসমত আলী দোকান এলাকায় মহড়া দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তারা কাজিরখীল এলাকাতেও শক্তি প্রদর্শন করে বলে স্থানীয়রা জানান।

সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে বিরোধ মীমাংসার জন্য সংশ্লিষ্টরা কেরানীহাট সিটি সেন্টারে জড়ো হন। সেখানে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে হামীম লোহার রড দিয়ে রোহানের হাতে আঘাত করেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এর পর রোহান তার সঙ্গে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে হামীমকে পেটে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে যান বলে অভিযোগ। গুরুতর আহত অবস্থায় হামীমকে উদ্ধার করে কেরানীহাটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর স্থানীয়রা রোহানকে ধাওয়া করে ঢেমশা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন সংলগ্ন মাস্টার বাড়ি এলাকা থেকে আটক করেন। পরে তাকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। গণপিটুনির পর স্থানীয়দের কাছে দেওয়া এক ভিডিও বক্তব্যে রোহান দাবি করেন, হামীমের সঙ্গে তাদের এলাকার ছেলেদের বিরোধ থাকলেও তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। তার দাবি, কেরানীহাট সিটি সেন্টারে হামীম তাকে লোহার রড দিয়ে আঘাত করলে তিনি রাগান্বিত হয়ে ছুরিকাঘাত করেন।

হাসমত আলী সিকদার দোকান ও আশপাশের এলাকায় কথা বলে স্থানীয়দের মধ্যে মাদক নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের চিত্র পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি বলেন, একসময় এলাকায় মাদকের এমন ভয়াবহতা ছিল না। গত এক-দুই বছরে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। তার ভাষায়, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে তারা প্রায়ই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, প্রশাসন যদি শুরু থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিত, তাহলে কিশোর গ্যাংয়ের এমন বিস্তার ঘটত না। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একটি বিরোধের পরিণতি তরুণের প্রাণহানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে কিছু এলাকায় উঠতি বয়সী তরুণদের আড্ডা ও চলাচল বেড়ে যায়। এসব আড্ডাকে ঘিরে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্তানদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত। মাদকের কারণে সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

ছদাহা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আইয়ুব বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের পক্ষে একা মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রশাসন আন্তরিকভাবে এগিয়ে এলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাদক প্রতিরোধে কাজ করা সম্ভব। এজন্য দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনার মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতের স্বজনরা মামলা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাদক প্রসঙ্গে ওসি বলেন, শুধু হাসমত আলী সিকদারের দোকান নয়, সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে ইউনিয়নে ইউনিয়নে র‌্যালি ও সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, প্রাথমিকভাবে পূর্ববিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে বিরোধের মূল কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না কিংবা কারও ইন্ধন ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার রোহানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার মূল কারণ ও বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।

হামীমের মৃত্যু শুধু একটি ছুরিকাঘাতের ঘটনা নয়—এটি সাতকানিয়ার কিছু এলাকায় মাদক, কিশোর গ্যাং, আধিপত্য বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে। অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে—মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কোথায় ছিল? কিশোরদের হাতে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া চললে তা আগে থেকে শনাক্ত করা হয়নি কেন? স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী কোনো এলাকায় মাদক বিকিকিনি দীর্ঘদিন চললে তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি কতটা কার্যকর ছিল? আর একটি বিরোধ যখন প্রকাশ্যে মহড়া ও শক্তি প্রদর্শনের পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন তা হত্যাকাণ্ডে রূপ নেওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন হস্তক্ষেপ করতে পারেনি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন এলাকাবাসী চাইছেন।

এফপি/অ
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝