বদলির আদেশের পরও কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন কর্মস্থল ছাড়েননি, এমন অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরের আদেশ অনুযায়ী ওনাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করার কথা থাকলেও শুক্রবার রাত পর্যন্ত তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তথ্যটি প্রচার পাবার পর কক্সবাজারের সচেতন মহল ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরে কি এমন মধু রয়েছে- যার টানে তিনি এখান থেকে যেতে চাচ্ছেন না? কারণ এর আগেও একাধিকবার বদলির আদেশ পেয়ে তদবিরে তা বাতিল করিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
বেবিচক সদর দপ্তর, কুর্মিটোলা, ঢাকা থেকে গত ৯ আগস্ট জারি করা অফিস আদেশে (স্মারক নম্বর ৩০.৩১.০০০০.০০০.২১১.১৬.০০০২.২৬.৬৫২) গোলাম মোর্তজা হোসেনকে বেবিচকের এটিএম বিভাগে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়। একই আদেশে চেয়ারম্যান সচিবালয়ের পরিচালক সাবেরা রহমানকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. তিরান হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ অপরাহ্নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, স্ট্যান্ড রিলিজের সময়সীমা পার হওয়ার পরও গোলাম মোর্তজা হোসেন কক্সবাজার বিমানবন্দর ছাড়েননি। একই সঙ্গে বদলির আদেশ পুনর্বিবেচনা বা ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। এর আগেও তার বদলির উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রভাবশালী মহলে তদবিরে তা ঠেকানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে প্রায় পাঁচ বছর তিনি একই কর্মস্থলে রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থাপক পদটি পরিচালক পদে উন্নীত হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে একজন কর্মকর্তার অবস্থান এবং তার মূল পদ ও বর্তমান দায়িত্বের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টি বেবিচকের প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যেই গত ১৬ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া একটি লিখিত অভিযোগে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি পাইয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা নেয়া, ওভারটাইম বণ্টনে অনিয়ম, পছন্দের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত ওভারটাইম দেয়া, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, জেনারেটরের সরকারি জ্বালানি ব্যবহারে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ পরিচালনা নিয়েও অনিয়ম হয়েছে। সেখানে মাসিক দুই লাখ টাকা উৎকোচ নেয়া এবং নিয়মিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে পছন্দের ব্যক্তিকে লাউঞ্জ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভিআইপি যাত্রীদের নাস্তা বাবদ টাকা আদায়, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সরকারি মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ না করে সুবিধা নেয়ার অভিযোগও উত্তাপন করা হয়।
অভিযোগে বিমানবন্দর এলাকার খতিয়ানভুক্ত জমিতে গত দুই-তিন বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভবন নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরে এসব স্থাপনা নির্মাণে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিমানবন্দরের জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন হোটেল-রিসোর্ট মালিক ও এনজিও কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরে ভিআইপি সুবিধা দেয়ার বিনিময়ে অর্থ নেয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এর আগে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বদলির উদ্যোগ নেয়া হলেও রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির করে তা ঠেকানো হয়েছিল। এমনকি দুই স্থানীয় বিএনপি নেতাকে পাঁচ লাখ টাকা দেয়ার মাধ্যমে একজন মন্ত্রীর কাছে তদবির করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি, লেনদেনের প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের তথ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়েও প্রশাসনিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, শুধু বদলি নয়, গোলাম মোর্তজা হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে গোলাম মোর্তজা হোসেনের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে, তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বক্তব্যের বিষয়সমূহ উল্লেখ করে শুক্রবার রাতে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ওনার স্ট্যান্ড রিলিজের (অবমুক্তি) বিষয়টি জানতে বেবিচক সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলমের মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা হয়। তিনিও ফোন না ধরায় বক্তব্যের বিষয় সমূহ উল্লেখ করে শুক্রবার রাতে খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে। নিউজ লেখা পর্যন্ত (রাত ১০টা) তার উত্তর পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে; বেবিচক সদর দপ্তরের লিখিত স্ট্যান্ড রিলিজ আদেশ শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে, নাকি আবারও তদবিরের কাছে থেমে যাবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত?
এফপি/অ