যুদ্ধ চলাকালীন নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার দাবি করেছে ইরান।
দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান একটি ‘নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামো’ গড়ে তুলেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত একটি তথ্যচিত্রে ওই কর্মকর্তা এসব কথা বলেন।
তার দাবি, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে ওই কর্মকর্তার পরিচয় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
পুরোনো মডেল থেকে সরে আসার দাবি
আইআরজিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধের আগের অভিজ্ঞতা ও সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষার ভিত্তিতেই ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি দেশটির প্রচলিত বা তুলনামূলকভাবে ‘ক্লাসিক’ আকাশ প্রতিরক্ষা মডেল থেকে সরে এসে আরও নমনীয় ও অভিযোজনক্ষম একটি কাঠামোর দিকে যাওয়ার উদ্যোগ।
নতুন ব্যবস্থায় শুধু অস্ত্র ও সরঞ্জামেই পরিবর্তন আনা হয়নি; বরং আকাশ প্রতিরক্ষার পুরো কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধকৌশল, সরঞ্জাম ব্যবহারের পদ্ধতি, কারিগরি প্রক্রিয়া এবং আকাশসীমা থেকে তথ্য সংগ্রহ ও তা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ইউনিটের মধ্যে আদান-প্রদানের ব্যবস্থায় পরিবর্তন।
কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন
আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষায় শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা রাডারের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়; দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, তা বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্যে নতুন কাঠামোয় এই বিষয়টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তার দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, যাচাই ও ভাগাভাগি করা হবে, সেই ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এর ফলে শত্রুপক্ষের বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখার দাবি
আইআরজিসির ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেছেন, নতুন কাঠামো যুদ্ধের সময় ইরানকে নিজেদের আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে সহায়তা করেছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা কাজে লাগিয়ে ইরান শুধু প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর নির্ভর না করে কমান্ড কাঠামো, প্রশিক্ষণ, কৌশল এবং কারিগরি প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন এনেছে।
এর ফলে সংঘাতের সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হলেও এর একটি বড় অংশ কার্যকর রাখা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ইরানি কর্মকর্তার এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কৌশল
সাম্প্রতিক সংঘাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। উন্নত যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশপথের অস্ত্র মোকাবিলায় শুধু স্থির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়- এমন বাস্তবতা বিভিন্ন সংঘাতে সামনে এসেছে।
ইরানের ক্ষেত্রেও যুদ্ধের সময় নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ফার্সের প্রকাশিত তথ্যচিত্রে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশটির সামরিক নেতৃত্ব তাদের প্রচলিত কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেয়।
নতুন কাঠামোয় যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত কৌশল পরিবর্তন, বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় এবং তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত
ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে আসছে। দেশটির সামরিক বাহিনী বিভিন্ন ধরনের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি ও মোতায়েন করেছে।
তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও দুর্বলতা- দুই দিকই সামনে এনেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যৎ সংঘাতের কথা মাথায় রেখে ইরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীভূত, নমনীয় ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করার চেষ্টা করছে।
আইআরজিসি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন শুধু নতুন অস্ত্র বা সরঞ্জাম যুক্ত করার বিষয় নয়; বরং যুদ্ধ পরিচালনা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ফলে ইরানের দাবি সত্য হলে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে নতুন কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং ভবিষ্যৎ কোনও সংঘাতে তা কতটা সফল হবে, তা নির্ধারণ করবে এর বাস্তব প্রয়োগ ও সামরিক সক্ষমতা।
এফপি/র