Dhaka, Monday | 17 August 2026
         
English Edition
   
Epaper | Monday | 17 August 2026 | English
শিরোনাম:

ইরান যুদ্ধে পিছু হটছে ট্রাম্প প্রশাসন? ভ্যান্সের বক্তব্যে নতুন ইঙ্গিত

প্রকাশ: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম  (ভিজিটর : ৩৩)

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে একের পর এক নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য শিথিল করছে। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ‘পূর্ণ আত্মসমর্পণ’, সরকার পরিবর্তন, দেশটির পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস এবং হিজবুল্লাহর মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করার মতো কঠোর লক্ষ্য সামনে রেখেছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু যুদ্ধ গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই তালিকা ক্রমেই ছোট ও নমনীয় হয়ে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই পরিবর্তনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি মাত্র দুটি লক্ষ্য তুলে ধরেন।

ভ্যান্স বলেন, প্রথম লক্ষ্য হলো উপসাগরীয় দেশগুলো যেন বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারে এবং এর মাধ্যমে জ্বালানির দামে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। 

তার ভাষায়, ‘‘লক্ষ্য নম্বর এক- আমেরিকার সর্বত্র তেল ও গ্যাসের দাম কম রাখা।’’

এরপর দ্বিতীয় লক্ষ্য হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘নিশ্চিত করা যে, ইরান যেন কখনওই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’’

ভ্যান্সের এই বক্তব্যে বিশেষ করে দুটি বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার বিষয়টি এখন আর একমাত্র বা প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্যকে যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে প্রকাশ্যে সামনে আনা হয়েছে- যা যুদ্ধের শুরুতে প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল না।

শুক্রবার ভ্যান্সের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে দুটি লক্ষ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিষয়টি এত দিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এমনকি যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মূল্যের বিষয়টি ট্রাম্প নিজেই গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। মে মাসে যুদ্ধের সমাধানের ক্ষেত্রে আমেরিকানদের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘‘একটুও না।’’

সে সময় ট্রাম্পের অবস্থান ছিল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর সঙ্গে অন্য কোনও অর্থনৈতিক বিষয়কে সমীকরণে আনা হবে না। 

শুক্রবারও তিনি বলেন, ইরান ইস্যুতে ঝুঁকি এত বেশি যে, আমেরিকানদের জ্বালানির জন্য কিছুটা বেশি অর্থ দিতে হলেও তিনি এর জন্য ‘কখনও ক্ষমা চাইবেন না।’

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্টতা

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানে অবশ্য শুরু থেকেই কিছুটা অসামঞ্জস্য ছিল। মার্চে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল, যুদ্ধের জন্য প্রায়ই চারটি প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু কে বক্তব্য দিচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে সেই চারটি লক্ষ্যও বদলে যাচ্ছিল।

কোনও কোনও তালিকায় ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করার বিষয়টি ছিল। আবার অন্য তালিকায় তা অনুপস্থিত ছিল। কোথাও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে, কোথাও তা উল্লেখ করা হয়নি। কোনও কোনও কর্মকর্তা ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী ধ্বংসের কথা বলেছেন; আবার কেউ কেউ শুধু নৌবাহিনীর কথা বলেছেন।

অর্থাৎ যুদ্ধ চলার সময়ই যেন প্রশাসন নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণ করে যাচ্ছিল।

তবে একটি বিষয় ছিল প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিন্ন- যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে তেল ও গ্যাসের দাম কম রাখা কখনওই যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল না।

‘পুরোনো অবস্থায়’ ফিরলেই কি যুদ্ধের সাফল্য?

ভ্যান্সের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিকে যুদ্ধের ‘প্রথম লক্ষ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।

ফলে যুদ্ধের লক্ষ্য যদি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা হয়, তাহলে সেটি মূলত যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার লক্ষ্য। এর বিপরীতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা হবে এমন একটি লক্ষ্য, যা যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার তুলনায় নতুন কোনও অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ কারণে প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বক্তব্যে জ্বালানির দামকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা যুদ্ধের লক্ষ্য শিথিল করার সর্বশেষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি এমন এক সমাপ্তির প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিতে পারে, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের শুরুতে যে উচ্চাভিলাষী ও কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, তার তুলনায় অনেক কম অর্জন নিয়েই সংঘাত শেষ করতে চাইছে।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও কি অবস্থান নরম হচ্ছে?

গত কয়েক মাসে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে।

প্রশাসন আগে ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে বাধ্য করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে মনে হয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে এবং দেশটির পারমাণবিক উপাদান এত গভীরে পুঁতে রাখা হয়েছে যে, সেগুলো সহজে উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

তিনি এমন সম্ভাবনার কথাও বলেছেন যে, ইরান মাটির নিচে থাকা ওই উপাদান উদ্ধারের চেষ্টা করছে কি না, তা যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ থেকে নজরদারি করে দেখতে পারে।

এমনকি এক পর্যায়ে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইতোমধ্যেই ‘পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত’ হয়ে গেছে।

এসব বক্তব্য থেকে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো বুঝতে পারছে- ইরানকে এমন একটি কঠোর ও ব্যাপক পরমাণু চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করা সম্ভব নাও হতে পারে, যা যুদ্ধের শুরুতে ওয়াশিংটন চেয়েছিল।

যুদ্ধের ছয় মাসে লক্ষ্য কতটা বদলেছে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে।

মে মাসের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, মার্কিন প্রশাসন আগের কিছু লক্ষ্যকে আর আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না। জুনে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছায়, যেখানে যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত অনেক লক্ষ্যই প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

এরপর গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ট্রাম্পের বক্তব্যেও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এখন ভ্যান্সের বক্তব্যে তেল ও গ্যাসের দামকে ‘এক নম্বর লক্ষ্য’ হিসেবে তুলে ধরা সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি ধাপ বলে মনে হচ্ছে।

অর্থাৎ যুদ্ধের শুরুতে যে লক্ষ্য ছিল ইরানকে কঠোরভাবে চাপে ফেলে তার সামরিক, পারমাণবিক ও আঞ্চলিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে সীমিত করা, এখন সেই অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন একটি সমাপ্তির দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে যুদ্ধ-পূর্ব পরিস্থিতির কাছাকাছি ফিরে যাওয়াকেও সাফল্য হিসেবে দেখানো হতে পারে।

আর যদি সত্যিই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য এখন যুদ্ধ-পূর্ব তেল ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা হয়ে থাকে, তাহলে তা ইরান যুদ্ধ থেকে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে কতটা অর্জন করতে পেরেছে- সে প্রশ্নই আরও জোরালো করে তোলে। সূত্র: সিএনএন

এফপি/র
সর্বশেষ সংবাদ  
সর্বাধিক পঠিত  
YOU MAY ALSO LIKE  
Editor & Publisher: S. M. Mesbah Uddin
Editorial, News and Commercial Offices: Akram Tower, 15/5, Bijoynagar (9th Floor), Ramna, Dhaka-1000
Call: 01713-180024, 01675-383357 & 01840-000044
E-mail: [email protected], [email protected], [email protected]
...
🔝